নিয়ন মতিয়ুল :: বছর দেড়েক আগের কথা। যাচ্ছিলাম অফিসে। বাটা সিগন্যাল থেকে বাসে উঠলাম। খালি সিট পেয়ে বসে পড়লাম। পাশে বসা সুশ্রী এক মিশুক তরুণের সঙ্গে দ্রুতই আলাপ জমে উঠলো। পরিচয় জেনে কোনো ইন্ট্রু না দিয়েই বললো, “সমাজে দুর্নীতি যেভাবে গেড়ে বসেছে, তাতে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি। আমি সহনশীল দুর্নীতির পক্ষে একটা প্রবন্ধ লিখেছি। ছাপবেন আপনার পত্রিকায়?”
কয়েক মুহূর্ত থমকে গেলাম। নিজেকে সামলে বললাম, “হ্যাঁ, বিশ্বব্যাংক তো দুর্নীতি মেনে ঘুসকে স্পিডমানি নাম দিয়েছে। প্রকৃতির নিয়মও তাই, যাকে এড়ানো যায় না, তার সঙ্গে খাপ খেয়ে নাও।” আমার কথা শুনে তরুণটির কৌতুহল বেপরোয়া। বলল, “দুর্নীতি এক ধরনের অর্থনীতি। এটাকে সহনশীলমাত্রায় নিয়ন্ত্রণ করা গেলে রাষ্ট্রও উপকৃত হবে। স্কুলের পাঠ্যসূচিতেও রাখা উচিত।”
আলাপের এক পর্যায়ে ফোন নম্বর, ইমেইল আদান-প্রদান হলো। পল্টন মোড়ে এসে নামতেই তরুণটি বলল, “ভাইয়া, লেখাটা আজই পাঠাবো, দেখবেন।” পরদিনই লেখাটা পেলাম। যুক্তির চেয়ে আবেগই বেশি। ভাবলাম, থিমটা দারুণ। এর মধ্যেই ফোন, “ভাইয়া লেখাটা কি প্রকাশ হবে?” বললাম, “যুক্তির মেরুদণ্ড শক্ত করার চেষ্টায় আছি, দেখছি।”
লেখাটা এখনও প্রকাশ করা হয়নি। এর মধ্যে বেনজীরের নজিরবিহীন দুর্নীতি আর ছাগলকাণ্ড নিয়ে উত্তাল নেটদুনিয়া। অনেকেই বলছেন, দুর্নীতি এখন শিল্পের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। সোশ্যাল মিডিয়া যখন দুর্নীতির আলোচনায় সয়লাব তখন হঠাৎই ‘প্রত্যয় পেনশন স্কিম’ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আর কোটা সংস্কারের দাবি নিয়ে শিক্ষার্থীরা নেমেছেন রাস্তায়।
অফিসে এক আলাপে বললাম, দেশের সহজ-সরল আন্দোলনগুলোও গিলে ফেলে পক্ষ-বিপক্ষের রাজনীতি। সহকর্মী বললেন, “ভাই, এটা তো আমলাদের কাণ্ড। সোশ্যাল মিডিয়া কাঁপানো পোলাপানদের হাতে ইস্যু ধরিয়ে দিয়ে দৃষ্টি সরানোর চেষ্টা। নেটদুনিয়া দখল করে রাখবে কোটা, দুর্নীতি উধাও।” মনে পড়ল নোয়াম চমস্কির কথা। জনগণ হলো বিভ্রান্ত পশুর পালের মতো। বল প্রয়োগে তাদের নিয়ন্ত্রণের সুযোগ না থাকলে, নিয়ন্ত্রণ করা হয় ‘ক্যালকুলেটেড ম্যানুফ্যাকচার অব কনসেন্ট’ এর মাধ্যমে।
কিন্তু একি! আজ সকালে ফেসবুক খুলে দেখি, কোটা বা পেনশন স্কিম নিয়ে কোনো আওয়াজ নেই। চারদিকে শুধুই নামাজকাণ্ডের আবেদ আলী। কুলি থেকে পিএসসি চেয়ারম্যানের ড্রাইভার, বিসিএসের প্রশ্নফাঁসের নায়ক, হাতে আলাদীনের প্রদীপ। বলছেন, প্রশ্নফাঁস থেকে যা কামাইছেন, সব আল্লার পথে খরচ করেছেন! চোখ কচলে ভাবলাম, আমলাদের ‘ক্যালকুলেটেড ম্যানুফ্যাকচার অব কনসেন্ট’ কি ফেল মারলো? নাকি এখন ‘দূর-নীতি’ ইন্টারটেইনমেন্টে রূপ নিয়েছে?
লেখক : নিয়ন মতিয়ুল, গণমাধ্যমকর্মী, ঢাকা।
আরও পড়ুন:
দেশে ভালো সম্পাদক, বার্তা সম্পাদকের সংকট
ঘূর্ণিঝড়ে রবীন্দ্রসংগীত, ভুনা খিচুড়ি!
সাংবাদিকতা নিয়ে যখন সাংবাদিকতা
অ-রাজনীতিকে ‘মহিমান্বিত’ করছে গণমাধ্যম
গণমাধ্যমের পুঁজি ‘দুর্নিবার কৌতুহল’
মূলধারায় ‘মাল্টিমিডিয়া’ উন্মাদনা
উদ্বোধনী লিড : কেন কৌতুহল বাড়ায়
সাংবাদিকদের কেন একইসঙ্গে ‘বস্তিজীবন’ আর ‘রাজসিক জীবন?