নিয়ন মতিয়ুল :: মূলধারার একটি জাতীয় দৈনিকের উপজেলায় দায়িত্ব পালন করা মেধাবী এক সাংবাদিকের সঙ্গে আলাপে গতকাল থেকে মনটা খারাপ। মাস ছয়েক আগে স্থানীয় ইস্যু নিয়ে একটা রিপোর্ট পাঠিয়েছিলেন অফিসে। দরকারি সব পক্ষের বক্তব্যও ছিল। অথচ মফস্বল সম্পাদক হঠাৎ চড়াও হয়ে অভদ্র ভাষায় গালাগালি করলেন। সেই যে চুপসে গেলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী তরুণ সংবাদিক, আর কথা বলেননি অফিসে। চাপাকষ্টে নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন শুধু।
মনে পড়ল এক শিক্ষকের কথা। এক জাতীয় দৈনিকে জেলা প্রতিনিধি হয়ে কাজ করতেন। সাক্ষাতে জানালেন, তিনি আর পারছেন না। মফস্বল ডেস্ক থেকে যেভাবে কথা বলা হয়, তাতে তার আত্মসম্মানে লাগে। চমকে গেলাম শুনে। কারণ দৈনিকটি একেবারে অভিজাত। অথচ তারা এক সম্মানিত শিক্ষককে ধমকাধমকি করেন চাকর-বাকরের মতো।
বছর দেড়েক আগে জেলায় গিয়ে এক তরুণ সংবাদকর্মীর সঙ্গে আলাপ। টপ লেভেলের এক অনলাইনের কাজ সে ছেড়ে দিয়েছে। বলল, ভীষণ চাপ, ধমকাধমকি, অযৌক্তিক নির্দেশনা- আর পারছিলাম না। বললাম, সাংবাদিকতা তো চাপেরই। বলল, চাপ তো নিতেই পারি। অসম্মান তো নিতে পারি না। আরেকজন বললেন, সিনিয়র হয়ে গেছি, অথচ ডেস্ক থেকে সেই সম্মানটুকু দেয় না।
কিছুদিন আগে উত্তরবঙ্গের এক সাংবাদিকের গল্প শুনলাম। দুর্দান্ত লিখতে পারেন বলে যুক্ত হয়েছিলেন সাংবাদিকতায়। একটি জাতীয় দৈনিকের উপজেলায় দায়িত্ব পালন করছেন বছর দশেক ধরে। মাঝখানে ভেবেছিলেন, ঢাকায় গিয়ে মেধার স্বাক্ষর রেখে ক্যারিয়ার গড়বেন। কিন্তু একা মাকে রেখে আসা হয়নি। দারুণ সব রিপোর্ট করে প্রশংসা পান। অথচ প্রমোশন তো দূরের কথা, আজ অবধি নিয়োগই পাননি। সাংবাদিকতার ব্ল্যাকহোলে ঢুকে আর বেরুতে পারছেন না।
দক্ষিণাঞ্চলের এক সাংবাদিকের সঙ্গে আলাপ। বললেন, ভাই, মফস্বল সম্পাদকেরা তো সব সময় ১৮০ ডিগ্রিতে থাকেন। কোনো দিক নির্দেশনা, আইডিয়া, মতামত নেই, শুধু চাই ভালো রিপোর্ট। ভালো বেতন দেওয়া পত্রিকায় ভালো রিপোর্ট বের হলেই ঝাড়ি মারেন। বলেন, এমন রিপোর্ট ওরা পায়, তুমি কি ঘাস কাটো? প্রতিবাদ করলেই রিপোর্ট বন্ধের হুমকিধামকি দেওয়া হয়। ভাই, কিছু তো পাওয়ার নেই, সামান্য ভালো ব্যবহার, সেটাও কি পাব না?
ঘটনা আর গল্পগুলো শুনে মনে হয়, মফস্বল সম্পাদকেরা আলু-পটল বা মুরগি বেচাকেনা ছেড়ে সাংবাদিকতায় এসেছেন। ঝুড়িতে যোগাযোগের ভাষা নেই। একদম এক্সপায়ারড। ঢাকায় এসিরুমে বসে এরা নিজেদের মধ্যযুগের জমিদার ভাবেন। জেলা-উপজেলার সাংবাদিকদের ভাবেন প্রজা। মগজের ভাঁজে ভাঁজে উপনিবেশিকতা। এরা না বোঝে ব্যবস্থাপনা, না জানে আধুনিকতা।
শুধুই কি মফস্বল সম্পাদকেরা দায়ি, এসব পত্রিকার সম্পাদকেরাও তামাদি, ভীষণ ব্যাকডেটেড। নিজেরা অথর্ব হওয়ায় মফস্বলের মতো গুরুত্বপূর্ণ ডেস্কের দায়িত্বও দেন নড়বড়েদের। রিপোর্টের বদলে এদের মাথাভর্তি বিজ্ঞাপন। ভালো সাংবাদিকতা এদের টানে না। মফস্বলে প্রতিনিধি নিয়োগে লেনদেনে মুখিয়ে থাকেন, আইডি কার্ড বিক্রি করেন।
এমনিতেই দেশে সাংবাদিকতা গোল্লায় গেছে। একদল দালাল ভেগেছে। আরেক দল ইতোমধ্যে দালালির দৌড় প্রতিযোগিতায়। সংগঠনগুলো বেচাবিক্রি হয়ে গেছে। মফস্বলের প্রেসক্লাবগুলো নতুন কেবলা ঠিক করেছে। রাজধানীতে বাইনারি দালালির ভারসাম্যের খেলা চলছে। জনগণ গণমাধ্যমের মুলধারা থেকে মুখ ফিরিয়ে সামাজিক মাধ্যমেই ভরসা করছে। এমন পরিস্থিতিতেও মফস্বলের কঠোর পরিশ্রমী সাংবাদিকদের ধমকাধমকি বিকৃতমানসিকতা ছাড়া কিছুই নয়।
লেখক : নিয়ন মতিয়ুল, গণমাধ্যমকর্মী, ঢাকা।
আরও পড়ুন :
ভাইয়া, ‘দূর-নীতিকে’ বৈধতা দেওয়া যায় না?
দেশে ভালো সম্পাদক, বার্তা সম্পাদকের সংকট
ঘূর্ণিঝড়ে রবীন্দ্রসংগীত, ভুনা খিচুড়ি!
সাংবাদিকতা নিয়ে যখন সাংবাদিকতা
অ-রাজনীতিকে ‘মহিমান্বিত’ করছে গণমাধ্যম
গণমাধ্যমের পুঁজি ‘দুর্নিবার কৌতুহল’
মূলধারায় ‘মাল্টিমিডিয়া’ উন্মাদনা
উদ্বোধনী লিড : কেন কৌতুহল বাড়ায়
সাংবাদিকদের কেন একইসঙ্গে ‘বস্তিজীবন’ আর ‘রাজসিক জীবন?