নিয়ন মতিয়ুল :: মাস দেড়েক আগে ষাটোর্ধ সাবেক এক সহকর্মীর ফোন। বললেন, ‘আগের অফিসে তো চাকরি নাই। বসে থেকে তো চলে না। কম বেতনে একটা পত্রিকায় ঢুকছি। চলতে পারছি না। আপারে (সঙ্গিনী) বইলেন তো।’ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত সেই সহকর্মীর প্রতিমাসের চিকিৎসা ব্যয় আর সামলাতে পারছেন না। ঘটনা শুনে বুকটা ভেঙে গেল।
পঞ্চাশোর্ধ আরেক সহকর্মী প্রায়ই বলেন, ‘বেতন কম মানলাম ভাই, কাজেরই তো পরিবেশ নাই। ভালো বেতনের চাকরিও পাচ্ছি না। বউ-ছল নিয়ে আর কেমনে চলব?’ পত্রিকার এডমিনে জব করা সাবেক আরেক সহকর্মীর চাকরি নেই দু’মাস হলো। পরিচিত একজনের অফিসে গেলে তিনি পরাশর্ম দিয়েছেন, ‘নিউজ আপলোড করা শেখেন, চাকরি পাবেন। ’ ফোনে তার অসহায় কণ্ঠ।
বয়স চল্লিশ ছুঁই ছুঁই এমন মেধাবী সাবেক এক সহকর্মী দুই বছর ধরে প্রায় বেকার। ভালো সুযোগ খুঁজছেন। কিন্তু সিন্ডিকেটের কাছে পরাজিত। গ্রামের বাড়ি আর শ্বশুরবাড়ির সহায়তা নিয়ে স্ত্রী-সন্তাদের বাঁচিয়ে রেখেছেন। স্বপ্ন, উদ্দীপনা, স্পিড মরে যাচ্ছে দ্রুত। পেশার বাইরে কিছু করার চেষ্টাতে বার বার হোঁচট খাচ্ছেন।
প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো অফিসে সংবাদকর্মী ছাঁটাই হচ্ছে। সেই তালিকার শীর্ষে থাকছেন, বেশি বেতনের সিনিয়ররা। যাদের ‘স্পিড’ নাকি কমে গেছে। এভাবে অসংখ্য সিনিয়র (৪০+) সংবাদকর্মী ভাই-বোন বেকার, অর্ধ-বেকার হয়ে গেছেন। যাদের হাতে কোনো সঞ্চয় বা পুঁজি নেই। সংসার চালানোর সামর্থও প্রায় নেই। বাপ-দাদার সম্পদও শেষ হতে চলেছে।
ক’বছর আগে দু-একটা সংবাদমাধ্যমের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে বয়স ৩০ বছরের নিচে আটকে দিতে দেখেছিলাম। এখনও অনলাইন বা ডিজিটালে ফ্রেশার বা কম অভিজ্ঞদের বেশি টানা হচ্ছে। কারণ, কম বেতনে মিলছে আনলিমিটেড স্পিড বা স্পিরিট। মূলধারার সনাতনী পত্রিকাগুলোতে বেশি বেতনের অভিজ্ঞদের ঝেরে ফেলে খোঁজা হচ্ছে কম বেতনের তরুণদের। তাছাড়া বেতন নির্ধারণেও ব্যাপক বৈষম্য। মাসের পর মাস সেই বেতনও বকেয়া থাকছে।
এসব কারণে সংবাদমাধ্যমে সিনিয়রদের বেকারত্ব ভয়াবহ আকার নিচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি অন্যসব চাকরিতে পেনশনসহ অবসর মিললেও সংবাদমাধ্যমে তা নেই। ফলে শূন্যহাতে ঝুঁকিপূর্ণ অনিশ্চিত অবসরে ফেরা এখন এক বিভীষিকা। শেষ আশ্রয় হিসেবে দেশে সে ভাবে প্রবীণ নিবাসও গড়ে ওঠেনি। ফলে অন্যের অধিকার নিশ্চিত করতে গিয়ে পরিবার আর নিজেকে অনবরত বঞ্চিত করে যাওয়া পেশাদার ভালো সংবাদকর্মীদের জীবন সত্যিই আজ বিপন্ন।
যে জনগণ আর সিস্টেমের বিরুদ্ধে আজীবন লড়াই করে গেলেন, অসামাজিক আখ্যা পেলেন, সেই তারাও এখন সাংবাদিকদের দেখতে শুরু করেছে শ্রদ্ধা-সম্মানহীন সন্দেহের চোখে। সঞ্চয় না থাকা, আর্থিক অনিশ্চয়তায় এমনিতে প্রতিদিন মানবেতন জীবন কাটছে, তার ওপর সাধারণ মানুষের উপেক্ষা, করুণার দৃষ্টি সাংবাদিকতার অবশিষ্ট আত্মসম্মানবোধটুকুও ধুলায় লুটিয়ে পড়ছে।
সংবাদমাধ্যমে এত গল্প, কাহিনি লেখা সংবাদকর্মীদের নিয়ে লেখার সত্যিই কেউ নেই। তাই তাদের জীবনের পেছনের অজানা অধ্যায় রহস্যময়ই থেকে যায় আজীবন।
লেখক : নিয়ন মতিয়ুল, গণমাধ্যমকর্মী, ঢাকা।
আরও পড়ুনঃ
ভাইয়া, ‘দূর-নীতিকে’ বৈধতা দেওয়া যায় না?
দেশে ভালো সম্পাদক, বার্তা সম্পাদকের সংকট
ঘূর্ণিঝড়ে রবীন্দ্রসংগীত, ভুনা খিচুড়ি!
সাংবাদিকতা নিয়ে যখন সাংবাদিকতা
অ-রাজনীতিকে ‘মহিমান্বিত’ করছে গণমাধ্যম
গণমাধ্যমের পুঁজি ‘দুর্নিবার কৌতুহল’
মূলধারায় ‘মাল্টিমিডিয়া’ উন্মাদনা
উদ্বোধনী লিড : কেন কৌতুহল বাড়ায়
সাংবাদিকদের কেন একইসঙ্গে ‘বস্তিজীবন’ আর ‘রাজসিক জীবন?