মোহাম্মদ ওমর ফারুক দেওয়ান:: একটি শিশু জন্মগ্রহণ করে খালি হাতে। কোনো মূল্যবোধ নিয়ে সে জন্মায় না। বেড়ে ওঠার প্রতিটি ধাপে চারপাশের মানুষ আর পরিবেশের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার ভেতর দিয়ে তার মনে জন্ম নেয় সহানুভূতি। জন্ম নেয় দায়িত্ববোধ। জন্ম নেয় বিনয়ের বীজ। সেই বীজ কে বোনে? উত্তরটা সহজ। বাবা-মা আর শিক্ষক। তাদের বাদ দিয়ে কোনো সমাজে মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত হয় না। তাদের বাদ দিয়ে কোনো নৈতিক শিক্ষাও পরিপূর্ণতা লাভ করতে পারে না।
এই প্রশ্নটিই সম্প্রতি নতুন করে সামনে এনেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এক অনুষ্ঠানে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন শিক্ষক, অভিভাবক, সেলিব্রেটি ও সমাজ সংস্কারকদের সামনে। তার বক্তব্য নিছক একটি রাজনৈতিক ঘোষণা ছিল না। তা ছিল এক ধরনের আত্মজিজ্ঞাসা। প্রশ্নটি ছিল সহজ। দেশ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় এগোচ্ছে। কিন্তু শিশুদের হৃদয়ে কতটা মানবিকতা বোনা যাচ্ছে?
আলাপের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী ফিরে যান নিজের শৈশবে। একদিন বাড়ির এক কর্মচারীকে অপমানজনক ভাষায় সম্বোধন করেছিলেন তিনি। বাবা শহীদ জিয়া বিষয়টি জানতে পারেন। তিনি ছেলেকে কান ধরে সেই কর্মচারীর কাছে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করেন। ঘটনাটি ছোট। কিন্তু তার রেশ থেকে যায় বছরের পর বছর। দেশে ফেরার পর তিনি অনুভব করেছেন, ঠিক এই ধরনের পারিবারিক শিক্ষায় একটি ঘাটতি তৈরি হয়েছে সমাজে। এই ব্যক্তিগত স্মৃতিই যেন বেঁধে দেয় গোটা বক্তব্যের সুর। মূল্যবোধ কোনো পাঠ্যবইয়ের অধ্যায় নয় শুধু। তা তৈরি হয় দৈনন্দিন ছোট ছোট মুহূর্তে। একটি কথায়। একটি আচরণে। একটি প্রতিক্রিয়ায়।
ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ থেকে প্রধানমন্ত্রী প্রবেশ করেন সরকারি পরিকল্পনায়। তিনি জানান, আগামী প্রজন্মকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পাঠ্যক্রমে যুক্ত হচ্ছে নতুন অধ্যায়। সেখানে থাকবে নীতিবোধ। থাকবে সামাজিক মূল্যবোধ। থাকবে পারিবারিক মূল্যবোধও। পাশাপাশি সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশকে। এই ধারণাকে বলা হচ্ছে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’।
তবে এই পরিবর্তনের ভার তিনি একা পাঠ্যবইয়ের ওপর দিতে চান না। শিক্ষকদের সীমাবদ্ধতার কথা তিনি প্রকাশ্যেই স্বীকার করেন। তাদের সংকটের কথাও বলেন খোলাখুলি। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার। লক্ষ্য একটাই। শিক্ষকরা যেন অর্জিত জ্ঞান শিক্ষার্থীদের মধ্যে সঠিকভাবে ছড়িয়ে দিতে পারেন। কারণ শিক্ষক আর বাবা-মা, এই দুজনই মূল্যবোধ সৃষ্টির প্রকৃত কেন্দ্রবিন্দু। শ্রেণিকক্ষে যে কাজ শুরু হয়, তার পূর্ণতা আসে ঘরে। পূর্ণতা আসে সহপাঠ্যক্রমিক কার্যক্রমে। পূর্ণতা আসে স্বতঃস্ফূর্ত শৃঙ্খলার চর্চায়।
এই আয়োজনের সবচেয়ে জীবন্ত মুহূর্তটি আসে অন্য জায়গায়। সেটি আসে যখন প্রধানমন্ত্রী সরাসরি কথা বলেন শিশুদের সঙ্গে। তিনি জটিল কোনো নীতিকথা বলেন না। তিনি চান একটি সহজ প্রতিশ্রুতি। প্রতি বছর একটি করে গাছ লাগাতে হবে। স্কুলে হোক বা বাসার আশেপাশে। যেখানেই সুযোগ মেলে সেখানেই।
শুধু গাছ পোঁতাই শেষ কথা নয়। তিনি চান শিশুরা নিজেরাই খুঁজে বের করুক তথ্য। গাছটি কী প্রজাতির? গাছটি কতদিন বাঁচে? গাছটি কতটা অক্সিজেন উৎপাদন করে? গাছটি মানুষের কী কাজে লাগে? এভাবে প্রতি বছর একটি করে নতুন জ্ঞান যোগ হবে শিশুর ভাণ্ডারে। গাছটি বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাবে তার চারপাশও। ক্লান্ত বন্ধুরা পাবে ছায়ায় বিশ্রামের জায়গা। বাসার আশেপাশে বইবে ঠান্ডা, সুন্দর বাতাস। তার আহ্বান ছিল সরল – সকলে মিলে চেষ্টা করি, আমাদের এই বাংলাদেশটাকে আরও সবুজ করে গড়ে তুলতে।
গোটা বক্তব্য জুড়ে ঘুরেফিরে আসে একটি শব্দ। শব্দটি হলো নির্দয়তা। মানুষ, পশুপাখি বা প্রকৃতি, কারও প্রতিই যেন শিশুরা নির্দয় না হয়ে ওঠে। এই আশঙ্কা স্পষ্ট প্রধানমন্ত্রীর কথায়। এই আকাঙ্ক্ষাও সমান স্পষ্ট। তার মতে, মুরুব্বিদের প্রতি শ্রদ্ধা জরুরি। অসহায় মানুষকে সহযোগিতা করা জরুরি। বিনয়ী ভাষায় কথা বলাও জরুরি। এই সাধারণ, প্রায় পুরনো ধাঁচের গুণাবলিই আসলে একটি মানবিক সমাজের ভিত্তি। প্রশ্ন থেকে যায় একটি জায়গায়। দ্রুত বদলে যাওয়া সামাজিক বাস্তবতায় এই মূল্যবোধগুলো নতুন প্রজন্মের কাছে কীভাবে পৌঁছাবে? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তিনি ডাক দেন সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার। সরকার, শিক্ষক, অভিভাবক, সবাইকে।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে আবার ফিরে আসে বাবার প্রসঙ্গ। সময়টা ১৯৮৬ সাল। সৌদি আরবে তখন ওমরাহ পালন করছিলেন তিনি। এক ইন্দোনেশীয় ব্যক্তি বাংলাদেশের পরিচয় শুনে সঙ্গে সঙ্গে উচ্চারণ করেছিলেন জিয়াউর রহমানের নাম। তখন মানুষ শহীদ জিয়া আর বাংলাদেশকে একসঙ্গেই চিনত। সন্তান হিসেবে সেই মুহূর্তে পিতার জন্য তিনি গর্ব অনুভব করেছিলেন। এই ব্যক্তিগত স্মৃতিটুকু একটি কথা আবার মনে করিয়ে দেয়। একটি নাম কীভাবে একটি দেশের পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে। আর সেই পরিচয় গড়ে ওঠে ঠিক এমনই ছোট ছোট নৈতিক সিদ্ধান্তের ভেতর দিয়ে।
শেষ পর্যন্ত পুরো আয়োজনটি দাঁড়ায় একটি সরল উপলব্ধির ওপর। কেবল অর্থনৈতিক অগ্রগতি দিয়ে মানবিক বাংলাদেশ গড়া যায় না। কেবল প্রাতিষ্ঠানিক সনদ দিয়েও তা সম্ভব নয়। প্রয়োজন নৈতিক আর পারিবারিক মূল্যবোধের সমান্তরাল বিকাশ। আর এই কাজ কোনো একক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়। এটি কোনো একক মন্ত্রণালয়েরও দায়িত্ব নয়। শিক্ষক এই গল্পের অংশীদার। অভিভাবকও অংশীদার। শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও অংশীদার। এমনকি শিশুরা নিজেরাও এই গল্পের অংশীদার।
শিশুর ভেতর মূল্যবোধ জন্ম থেকে থাকে না। তা বেড়ে ওঠে প্রতিদিনের ছোট ছোট অভিজ্ঞতায়। একটি গাছের যত্নে। একটি ক্ষমা চাওয়ার মুহূর্তে। একজন প্রবীণের প্রতি সম্মানে। আর ঠিক এই জায়গাতেই লুকিয়ে থাকে প্রশ্নটির আসল উত্তর। মানবিক বাংলাদেশ গড়ার কাজ শুরু হয় না বড় কোনো নীতিতে। তা শুরু হয় একটি শিশুর হাতে লাগানো ছোট্ট একটি চারাগাছে।
লেখক: মোহাম্মদ ওমর ফারুক দেওয়ান, সিনিয়র উপপ্রধান তথ্য অফিসার, শিক্ষা মন্ত্রীর দপ্তর
পিআইডি ফিচার
লেখকের আরও লেখাঃ
গণমাধ্যমের শক্তি ও পেশাদারিত্ব
ভূমিকম্প সম্পর্কে আপনি কতটুকু সচেতন
ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার
জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সঙ্গতি রেখে শিশুদের অধিকার ও পরিবেশ উন্নয়নের আহবান