‘দখলসূত্রে’ খালের মালিক, ‘বন্যার অভিশাপে কেঁদে ওঠে পাড়া’

‘আষাঢ়ে বাদল নামে, নদী ভর ভর
মাতিয়া ছুটিয়া চলে ধারা খরতর।
মহাবেগে কলকল কোলাহল ওঠে,
ঘোলা জলে পাকগুলি ঘুরে ঘুরে ছোটে।
দুই কূলে বনে বনে পড়ে যায় সাড়া,
বরষার উৎসব জেগে ওঠে পাড়া!’

আবু মোশাররফ রাসেল :: ‘আমাদের ছোট নদী’ কবিতায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ষড়ঋতুর এই দেশের সতেজ বর্ষায় নদীর প্রকৃতি ও পরিস্থিতির বর্ণনা করেছিলেন এভাবে। কবির বর্ণনায়Ñআষাঢ় মাসে বৃষ্টি নামলে পানিতে ভরে উঠতো নদী, চারদিকে রূপের মাধুর্য ছড়িয়ে দ্রুত বয়ে যেতো নদীর স্রোত, দুই কূলে সাড়া পড়ে যেতো, উৎসবে জেগে উঠতো পাড়া বা গ্রামগুলো। কিন্তু এখন সেই বর্ষায় ‘উৎসবে পাড়া জেগে উঠে না’কেঁদে উঠে বন্যার অভিশাপে! এখন বর্ষা মানেই গ্রামীণ জনপদের মানুষের জন্য এক বিধ্বংসী আতংকের নাম। আবহমান বাংলার চিরন্তন প্রকৃতির বর্ষা এখন রুদ্রমূর্তিতে মানুষের সহায়-সম্পদ ও জীবন কেড়ে নিচ্ছে, মানুষকে কাঁদাচ্ছে, মানুষকে ভাসিয়ে নিচ্ছে, নিঃস্ব করে দিচ্ছে। গ্রামীণ জনপদের মানুষের কাছে এক সময়ের ‘সম্ভাবনা ও উচ্ছ্বাস’ নিয়ে হাজির হওয়া বর্ষা এখন কঠিন ও নতুন ভিন্ন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

‘স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা’ শব্দটির এই ‘স্মরণকাল’ এখন চট্টগ্রামের গ্রামীণ জনপদের মানুষের জন্য প্রতি বছরের ঘটনা। প্রতি বছর বন্যার পানির উচ্চতা বাড়ছে আর পানিতে ঘরবাড়ি, সহায়-সম্পদ ‘ডুবে থাকার’ সময়কাল বা স্থায়ীত্ব দীর্ঘ হচ্ছে। আগে যেখানে টানা ভারী বৃষ্টি হলেও সর্বোচ্চ দুয়েকদিনের মধ্যেই পানি নেমে যেতো এখন সেই বানের পানি লোকালয়ে স্থির হয়ে থাকছে ৫/৭দিনও। দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে দীর্ঘকাল থেকেই দেখে এসেছি, প্রতি বছর বর্ষায় কয়েক দফায় বন্যা হতো, ‘পাহাড়ি ঢলের’ পানিতে প্লাবিত হতো বিস্তীর্ণ জমি, রাস্তাঘাট-উঠানে বানের পানি আসলেও ঘরে ঢুকে পড়ার ঘটনা ছিল কদাচিৎ। বন্যা সৃষ্টি হওয়ারও একটি স্বাভাবিক গতি ছিল সে সময়। টানা কয়েকদিন ভারী বৃষ্টি হওয়ার পর তৃতীয় বা চতুর্থ দিনে গিয়ে বন্যা দেখা দিত। তবে বৃষ্টির মাত্রা সামান্য কমে আসলেই পানি দ্রুত লোকালয় থেকে নেমে যেতো। স্বাভাবিক বন্যা পরিস্থিতি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কিছুটা বিঘœ ঘটালেও কৃষি প্রধান গ্রামীণ জনপদে বন্যার নানা ধরনের উপকারিতার কথাও মুরুব্বীদের মুখে উচ্চারিত হতো। শুষ্ক মৌসুমে পানি সেচের অভাবে সেসব জমিতে চাষ করা সম্ভব হতো না, বর্ষায় সেসব জমিতেও চাষাবাদ করা যায় সে কারণে কৃষকরা বর্ষা আসলে খুশিই হতেন, গ্রীষ্মের খরায় বিবর্ণ হয়ে যাওয়া গাছ-গাছালি প্রাণ ফিরে পেয়ে গ্রাম থেকে বন-বনানী চারদিক সবুজের সমারোহে ভয়ে উঠতো, পুকুর-জলাশয়ে নানা প্রজাতির মাছ পাওয়া যেতো।

ভারী বৃষ্টিতে পুকুর-জলাশয়-বিল-ঝিল পানিতে টইটম্বুর হলে গ্রামের শিশু-কিশোররা উচ্ছ্বাসে মেতে উঠতো, তরুণদের অনেকে সেখানে মাছ ধরতে নেমে পড়তো আর মুরুব্বীরা বলতেন, ‘এবার ফলন ভালো হবো।’ অর্থাৎ গ্রামীণ জীবনে বর্ষা মানেই ছিল নবজীবন, নতুন সম্ভাবনা আর অপার আনন্দের উৎসব। আকাশভরা মেঘ, টুপটাপ বৃষ্টির শব্দ, কাঁচা মাটির গন্ধ আর সবুজে মোড়া প্রকৃতির নবজাগরণÑ এমন দৃশ্যই দেখতে দেখতে বড় হয়েছি। কিন্তু গত এক/দেড় দশকে বর্ষার সেই মায়াবী রূপ, আবেদন, সম্ভাবনার সবটুকুই চোখের সামনে হারিয়ে গেছে। গ্রামে এখন বর্ষা আর সেই প্রাণবন্ত আনন্দের বার্তা বয়ে আনে না বরং বৃষ্টি নামলেই মানুষের বুক কেঁপে ওঠে কখন যে নদীর পানি বাড়বে, কখন যে ঘরবাড়িতে ঢুকে পড়বে।

বর্ষা মানে এখন ভয়াবহ বন্যা। ঢলের পানিতে গ্রামের পর গ্রাম পানির নিচে তলিয়ে যায়। ঘরের ভেতর হাঁটু সমান পানি, রান্নাঘর ডুবে গেছে, গোয়ালঘরের গরু পানিতে দাঁড়িয়ে কাঁপছে, উঠানের মাটি হারিয়ে গেছে। মানুষ আশ্রয় নেয় উঁচু জায়গায়, স্কুলঘরে, কিংবা রাস্তার পাশে অস্থায়ী কোনো আশ্রয়ে। গ্রামের কৃষক; যার জীবনের সবকিছু নির্ভর করে ফসলের ওপর, সেই কৃষক সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। সদ্য রোপণ করা ধান ডুবে যায়, ক্ষেত ভেসে যায়, গরু-ছাগল মারা যায়। বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা সামান্য সম্পদ মুহূর্তের মধ্যে হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যায় পুরো পরিবার।

দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে গত সপ্তাহের ৫/৬ দিন স্থায়ী হওয়া এবারের বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনও নিরূপণ হয়নি। তবে সাতকানিয়া ও বাঁশখালীর অনেক মানুষের সাথে কথা বলেছি। তারা জানিয়েছেন, ‘এবারের বন্যায় ক্ষতির পরিমাণ বর্ণানাতীত, ’৯১ এর ভয়াল ঘূর্ণিঝড়ের মতোই মানুষের ঘরবাড়ি ও সহায়-সম্পদের ক্ষতি হয়েছে।’ সরকারি হিসাব বলছে, বন্যা ও পাহাড় ধসে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৮ জনে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে কক্সবাজারে, যার মধ্যে ১৯ জন স্থানীয় বাসিন্দা এবং ১৩ জন রোহিঙ্গা শরণার্থী। এছাড়া চট্টগ্রামে ১৫ জন, বান্দরবানে সাতজন, রাঙামাটিতে তিনজনের প্রাণহানি ঘটেছে। আর দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ১২ লাখ ছাড়িয়েছে।

এই প্রাণহানি এবং মানুষের সহায়-সম্পদের বিপুল ক্ষয়ক্ষতির দায় কার? কেন বর্ষা এমন আগ্রাসী হয়ে গেল? বর্ষার গতি-প্রকৃতি কি আসলেই বদলে গেছে? ঋতুবৈচিত্র্যে আষাঢ়-শ্রাবণ এই দুই মাস বর্ষাকাল। এই সময়ে বৃষ্টি হবে, এটা স্বাভাবিক। টানা বেশ কয়েকদিন ভারী বৃষ্টি হলে বন্যা দেখা দেওয়াটাও স্বাভাবিক। কিন্তু গত এক দশক ধরে বৃষ্টির পরিমাণে কিছুটা কম বেশি হয়েছে ঠিক; সেই তুলনায় প্লাবনের পরিস্থিতিটা একেবারেই অস্বাভাবিক। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত ১৫ বছর কিংবা ২০ বছর ধরেই বর্ষাকালে চট্টগ্রাম অঞ্চলে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণে খুব একটা হেরফের হয়নি। তথ্যগুলো দেখুন ২০১৫ সালে ৩,৬০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে (আবহাওয়া অধিদপ্তরের পর্যালোচনায় এটা খুব বেশি বৃষ্টির বছর), ২০১৬ সালে ৩,০০০ মিমি (মাঝারি-উচ্চ) ২০১৭ সালে ৩,৭৫০ মিমি (সর্বোচ্চ), ২০১৮ সালে ৩,২০০ মিমি (স্থিতিশীল উচ্চ বৃষ্টি) ২০১৯ সালে ২,৮০০ মিমি (কিছুটা কম), ২০২০ সালে ২,৩০০ মিমি (কম বৃষ্টির বছর), ২০২১ সালে ২,৬০০ মিমি (পুনরুদ্ধার শুরু), ২০২২ সালে ১,৭০০ মিমি (উল্লেখযোগ্য কম বৃষ্টি) ২০২৩ সালে ২,৮০০ মিমি (আবার বৃদ্ধি), ২০২৪ সালে ২১০০ মিমি (মাঝারি-কম), ২০২৫ সালে ২৪০০ মিমি (আনুমানিক) বৃষ্টি হয়েছে।

এই তথ্য প্রমাণ করছে গত এক দশকে চট্টগ্রামে গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ খুব একটা হেরফের হয়নি কিন্তু এ অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি ‘অস্বাভাবিক’ রূপ ধারণ করেছে। ২০২৩ সালেও দক্ষিণ চট্টগ্রামে ‘স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা’ হয়েছিল। সেই বছর কক্সবাজার রেললাইন নির্মাণ কাজ শেষ হয় এবং ট্রেন চলাচল শুরু হয়। সেবার পাহাড়ি ঢলের পানিতে সাতকানিয়া-চন্দনাইশ এলাকায় বড় ধরনের বন্যা এবং যথেষ্ট ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। সে সময় এই বন্যার জন্য স্থানীয় মানুষজন অপরিকল্পিতভাবে পানি চলাচলের পথে ট্রেন লাইন নির্মাণের কারণে বন্যা হয়েছে বলে দাবি করলেও কর্তৃপক্ষ তা নাকচ করে দিয়েছিল। অথচ স্থানীয় বিষয় নিয়ে স্থানীয় মানুষের পর্যবেক্ষণই সব সময় সঠিক ও বিজ্ঞানসম্মত। ট্রেন লাইন নির্মাণের পর বন্যার আগ্রাসী রূপই সাক্ষ্য দেয় এর পেছনের কারণ কী।

একটি বৃহৎ অঞ্চলে ১০-১৫ বছর ধরে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন না হলেও বছর বছর বন্যা পরিস্থিতি ‘অস্বাভাবিক হয়ে উঠার’ পেছনের কারণ কি? এ নিয়ে যথেষ্ট পর্যবেক্ষণ, আলোচনা এবং তথ্যগুলো ইতিবাচক দৃষ্টিতে গ্রহণ করার সৎসাহস দরকার। আগে গ্রামে বন্যা হলে বলা হতো পাহাড়ে বৃষ্টি বেশি হওয়ায় ‘পাহাড়ি ঢল’ নেমেছে। ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার পাহাড়-সমতলের মেলবন্ধন, পাহাড় থেকে সমতল হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে অনেক নদী। বর্ষায় পাহাড়ে ভারী বৃষ্টি হলে, সেই পানি নদী এবং তার শাখা খালগুলো দিয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়তো।

পাহাড়ি ঢলের পানি কখনো কখনো অস্বাভাবিক হয়ে গেলে, নদী সবটুকু ধারণ করতে পারতো না, তাতে দুই কূল উপচে লোকালয়ে বন্যা দেখা দিত। তবে বৃষ্টি কিছুটা কমলেও দ্রুত লোকালয়ের পানি শাখা খাল হয়ে নদীতে গিয়ে পড়তো এবং বন্যা চলে যেতো। এই যে পাহাড়, নদীর গতি, ধারণ ক্ষমতা এবং শাখা খাল হয়ে পানির যে স্বাভাবিক প্রবাহ ছিল, গত দুই দশকে ধীরে ধীরে তার পুরোটাই ধ্বংস হয়ে গেছে। এই সময়ে পাহাড়ের প্রাকৃতিক বন, সংরক্ষিত বনের গাছ উজাড় হয়ে গেছে, পাহাড় এখন ন্যাড়া। পাহাড়ে যখন গাছ ছিল, তখন বৃষ্টি প্রথমে পড়তো গাছে, তাতে পানির প্রবাহ ধীর হতো, পাহাড়ের মাটি ক্ষয় হতো না। এখন গাছ না থাকাতে বৃষ্টি সরাসরি পাহাড়ে পড়ে, তাতে পাহাড়ের মাটি ভেঙে-ধুয়ে নদীতে গিয়ে পড়ে, ধীরে ধীরে নদীগুলোর তলদেশ পাহাড়ি মাটিতে ভরাট হয়ে গেছে।

গ্রামে আগে বিস্তৃত ফসলের মাঠ, পুকুর-জলাশয় ছিল, বৃষ্টি হলে লোকালয়ের পানি প্রথমে সেখানে গিয়ে জমা হতো। কিন্তু গত কয়েক দশক ধরে কৃষিজমির ওপর আবাসন ও নানা ধরনের বাণিজ্যিক অবকাঠামো নির্মাণের আগ্রাসন এতই বেড়েছে যে, সেখানে অপরিকল্পিতভাবে বাড়িঘর নির্মাণের কারণে পানি চলাচলের সব পথ বন্ধ হয়ে গেছে। গ্রামে গেলেই কৃষিজমিতে এখন একটি সাইনবোর্ড অবধারিতভাবেই চোখে পড়বে ‘ক্রয়সূত্রে এই জায়গার মালিক…’। দুই/তিন ফসলি জমিতে রাতারাতি শত শত পাকা বাড়িঘর তৈরি হয়ে গেছে, পুকুর-জলাশয় ভরাট করে সেখানে বাণিজ্যিক অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। এখন বৃষ্টির পানি যাবে কোথায়? তার চেয়েও ভয়াবহ ব্যাপার ঘটেছে প্রাকৃতিক প্রবাহ নদী এবং তার শাখা খালগুলো নিয়ে। গ্রামের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নদীর দুইপাশ দখল করেছে বহু আগেই। নদী এবং শাখা খালগুলোতে অবৈধভাবে বাঁধ দিয়ে, স্লুইস গেইট বসিয়ে পানির প্রবাহ বন্ধ করে, সেখানে মাছ এবং লবণ চাষ করছে। দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ এই নদী-খালগুলোতে বিনা বাধায় প্রভাবশালীদের দখল এবং তাদের বাণিজ্যিক কার্যক্রম দেখে বলতে হয় নদী খালের মালিক যেন তারাই এবং সেটা ‘দখলসূত্রে’ কেনা!

একদিকে গাছ উজাড়ের কারণে পাহাড়ের পানি দ্রুত নদীতে নামে, নদীর প্রস্থ এবং নাব্যতা হারানোর কারণে পানি ধারণের ক্ষমতা হারিয়েছে এবং শাখা খালগুলোতে শত শত বাঁধ ও সøুইস গেইটের কারণে বন্যা বছর বছর বিধ্বংসী হয়ে উঠেছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম উঁচু জায়গা, পাহাড়ের পানিতে সমতলে বন্যা হতোÑকিন্তু আশ^র্যজনক বিষয় হলো এখনও সেই পাহাড়ি এলাকাও ভয়াবহ বন্যায় ডুবছে!

উপকূলীয় স্লুইস গেইটগুলোর মূল উদ্দেশ্য হল- জোয়ারের সময় সমুদ্রের লবণাক্ত পানি ভেতরে ঢুকতে না দেওয়া এবং ভাটার সময় উজানের বৃষ্টির পানি দ্রুত বের করে দেওয়া। কিন্তু বাস্তবে এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় স্লুইস গেইটগুলোকে থাকতে দেওয়া হচ্ছে না। পানি উন্নয়ন বোর্ড চট্টগ্রাম বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) তানজীর সাইফ আহমেদ বন্যার কারণ নিয়ে গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘মানুষের তৈরি প্রতিবন্ধকতার কারণে এবারের বন্যা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। পাউবোর কর্মীরা বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে স্লুইস গেইট খুলে দিলেও পরে আবার সেগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়।’ তার ভাষ্য, ‘কিছু এলাকায় প্রভাবশালী স্থানীয় গোষ্ঠী কাঠের গুঁড়ি ও তক্তা দিয়ে স্লুইস গেইট আটকে রাখছে, যাতে মাছের ঘের ও লবণক্ষেতে পানি ধরে রাখা যায়। এতে বন্যার পানি নামতে পারছে না।’

সরকারের দায়িত্বশীল একটি সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ভাষ্য থেকেই বোঝা যায়Ñএই বন্যা যতটা না প্রাকৃতিক তার চেয়ে বেশি মানবসৃষ্ট। কিছু প্রভাবশালী মানুষের তৈরি এই অভিশাপের শিকার গ্রামের লাখ লাখ মানুষের জীবন।

প্রাকৃতিক পানি প্রবাহে স্লুইস গেইটের আগ্রাসন কতটা ভয়াবহ হয়েছে তার প্রমাণ পাওয়া যায় ‘দৈনিক আগামীর সময়’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের তথ্য থেকে। বাঁশখালী উপজেলার ২১২টি গ্রামের পানি নিষ্কাশনের একমাত্র পথ ‘জলকদর খাল’। ৩২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই খাল বয়ে গেছে বাঁশখালীর মাঝ বরাবর। জলকদর ও এর সঙ্গে সংযুক্ত খালে আছে ২৪৬ স্লুইস গেট। এর মধ্যে বৈধ মাত্র ৮৯টি। বাকিগুলো স্থানীয় প্রভাবশালীরা আইনের তোয়াক্কা না করে নিজেদের খেয়ালখুশি মতো নির্মাণ করেছে। অবৈধভাবে নির্মিত এসব স্লুইস গেটের উপর পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এই ১৫৭ স্লুইসগেট এখন বাঁশখালীর মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আরও একটি উদাহরণ দেওয়া যাক-কক্সবাজারের চকরিয়া পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের প্রমত্তা মাতামুহুরী নদীর একটি শাখা খাল প্রবাহমান ছিল। ‘বাটাখালী খাল’ নামের সেই শাখা খালটি দিয়ে পুরো পৌরসভা এলাকার পানি মাতামুহুরী নদীতে গিয়ে পড়ত। কিন্তু অত্যন্ত আশ^র্যের বিষয়, বিগত সরকারের আমলে স্থানীয় বাসিন্দাদের অগোচরে পৌরসভা এই প্রাকৃতিক খালটি ঘিরে একটি অপরিকল্পিত প্রকল্প হাতে নেয়। ৩০-৪০ ফুট প্রস্থের আস্ত সেই খালটিকে ভরাট করে, দুই পাশে রিটেইনিং ওয়াল দিয়ে মাত্র ১০ ফুটের একটি নালা বানিয়ে ফেলেছে চকরিয়া পৌরসভা কর্তৃপক্ষ! এখন বৃষ্টি হলেই এলাকাটি বন্যায় তলিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান সরকার যেখানে সারা দেশের প্রাকৃতিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে, হারিয়ে যাওয়া খালগুলো উদ্ধারে খালখনন কর্মসূচি চালু করেছে, সেখানে বর্তমান সরকারে গুরুত্বপূর্ণ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এলাকাতেই খাল ভরাট করে নাল নির্মাণ করা হয়েছে।

এভাবে গত দুই দশক ধরেই অপরিকল্পিত প্রকল্পের কারণে একের পর এক প্রাকৃতিক প্রবাহ ধ্বংস হয়েছে, প্রকৃতি রুষ্ট হতে হতে বিধ্বংসী হয়ে এখন মানুষের ওপর থেকে তার প্রতিশোধ নিচ্ছে! প্রকৃতিকে নিজের মতো থাকতে না দিলে; মানুষ যে কোনোভাবেই ভালো থাকতে পারবে না তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ ভয়াবহ বন্যা এবং ঘূর্ণিঝড়। সুতরাং মানুষকে প্রকৃতির সাথে সহাবস্থান করতে হলে প্রকৃতির উপাদান বা প্রাকৃতিক সম্পদগুলোকে তার আপন গতিতে চলতে দিতে হবে।

একটি আশার বাণী দিয়ে শেষ করি। এবারের বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার বাঁশখালীর দুর্গত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ করতে গিয়েছিলেন সরকারের প্রভাবশালী অনেক নেতা-মন্ত্রী। এর মধ্যে চট্টগ্রামের কৃতী সন্তান, ভূমি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন এর একটি বক্তব্য আশান্বিত করেছে। তিনি সেখানে বলেছেন, ‘চট্টগ্রামে যে নজিরবিহীন ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে তার কারণ অনুসন্ধান করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিভিন্ন স্থানে যে যার মত করে স্লুইস গেট, কালভার্ট নির্মাণ করে পানির স্বাভাবিক চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশ আমরা ইতিমধ্যে বিভিন্ন স্থানে এসব অবৈধ বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। এছাড়া ভরাট হওয়া নদী ও খাল খননে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর হেলাল এই চট্টগ্রামের মাটি ও মানুষের সাথে মিশে বড় হওয়া একজন ‘ভূমিজ সন্তান’। গত ১০/১৫ বছর ধরে তাকে দেখেছি, তিনি ব্যক্তিত্বে-জ্ঞানে-গরিমায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলের যোগ্যতাসম্পন্ন একজন নেতৃত্ব হয়েও তৃণমূলের সাথে সংযোগ রেখেছেন সব সময়। বিদেশ থেকে উচ্চ শিক্ষা অর্জন করা এই তরুণ নেতা রাজনৈতিক জীবনে শহরের উঁচু তলায় বসে না থেকে প্রায় সময়ই ছুটে যান গ্রামীণ জনপদে, পাহাড়ের দুর্গম এলাকায়। সে কারণে তিনি, গ্রামাঞ্চলের নতুন সংকটগুলোর বাস্তব পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে পারেন সহজে।

তিনি এই সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়েরই একজন নেতা, অতীতে আমরা দেখেছি সরকারের পক্ষ থেকে ‘বাস্তবতাকে’ বারবার অস্বীকার করা হতো, এড়িয়ে যাওয়া হতো কিন্তু মীর হেলাল সেটা করেননি, তিনি বন্যার কারণ বুঝতে পেরেছেন এবং ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলেছেন। মন্ত্রী মহোদয়কে বলবোÑএখানে বন্যার যে কারণগুলো তুলে ধরেছি, সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে সেসব বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে, লাখ লাখ মানুষের জীবনকে স্বস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে পারেন। অন্যথায় প্রতি বর্ষায় দেশের হাজার কোটি টাকার সম্পদের ক্ষতি ও মানুষের প্রাণহানি ঘটতে থাকবে এবং সরকারকে ত্রাণ দিয়েই যেতে হবে। প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান ও প্রবাহকে নিজের মতো থাকতে দিতে হবেÑমানুষের বেঁচে থাকার প্রয়োজনেই।

লেখক : আবু মোশাররফ রাসেল, বার্তা সম্পাদক, দৈনিক পূর্বদেশ।

আরও পড়ুন