বাংলাদেশ রেলওয়ের ঢাকা বিভাগে সরকারি কোয়ার্টার বা বাসা বরাদ্দে চরম অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে সাবেক বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) ও বর্তমানে পূর্বাঞ্চলের চীফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট (সিওপিএস) সফিকুর রহমানের বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্ব পালনকালে নিয়মবহির্ভূতভাবে এক দপ্তরের বাসা অন্য দপ্তরের কর্মচারীর নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের বিনিময়ে প্রাপ্যতার বাইরে বড় আয়তনের বাসা বরাদ্দ, জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন এবং পিআরএল-সংক্রান্ত বিধি না মানার অভিযোগও রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বদলি হওয়ার পর তাঁর দপ্তরের বাসা বরাদ্দসংক্রান্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথি খুঁজে না পাওয়ার গুরুতর অভিযোগ।
সফিকুর রহমান ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঢাকা বিভাগের বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপকের দায়িত্বে ছিলেন। অভিযোগকারীদের দাবি, এ সময়ের মধ্যেই বাসা বরাদ্দে এসব অনিয়মের ঘটনা ঘটে। এসব অনিয়মের প্রতিকার ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবিতে ২০২৪ সালের ৩ নভেম্বর রেলওয়ে সচিব, মহাপরিচালক এবং ডিআরএম (ঢাকা) বরাবর দালিলিক প্রমাণসহ লিখিত অভিযোগ দেন ভুক্তভোগী কর্মচারীরা।
অভিযোগে বলা হয়েছে, সাবেক ডিআরএম সফিকুর রহমান গোপনীয়তা বজায় রেখে বাসা বরাদ্দের ফাইল অনুমোদন করতেন। একটি বরাদ্দ আদেশের সময় নিয়েও অভিযোগকারীরা গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের দাবি, ওই বরাদ্দ আদেশে সফিকুর রহমান ২০২৪ সালের ৯ মে স্বাক্ষর করলেও সেটি প্রায় পাঁচ মাস পর, ২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর প্রকাশ করা হয়। স্বাক্ষরের তারিখ ও প্রকাশের তারিখের মধ্যে এত দীর্ঘ ব্যবধানের কারণ কী—তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগী কর্মচারীরা।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগ উঠেছে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র গায়েবের বিষয়ে। ডিআরএম পদ থেকে সফিকুর রহমান বদলি হওয়ার পর তাঁর দপ্তরের বাসা বরাদ্দসংক্রান্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁদের ভাষ্য, গায়েব হওয়া এসব নথি উদ্ধার করে পর্যালোচনা করা হলে বাসা বরাদ্দে অনিয়মের আরও চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
লিখিত অভিযোগে বাসা বরাদ্দের সুনির্দিষ্ট কয়েকটি বিধিলঙ্ঘনের চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। অভিযোগকারীরা ১৯৮৮ সালের নীতিমালা এবং ২০১৬ ও ২০২১ সালের সংশোধিত পরিপত্রের উল্লেখ করে বলেছেন, কোনো কর্মচারীর পিআরএল বা অবসরোত্তর ছুটি শেষ হওয়ার ৩০ দিন আগে তাঁর বাসা অন্য কারও নামে বরাদ্দ দেওয়ার নিয়ম নেই। কিন্তু সংশ্লিষ্ট বিধি উপেক্ষা করেই বাসা বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ছাড়া প্রাপ্যতার বাইরে বড় আয়তনের বাসা বরাদ্দের অভিযোগও রয়েছে। নিয়ম অনুসারে সিএস টাইপের সর্বোচ্চ ৮৫০ বর্গফুট বাসার প্রাপ্যতা থাকলেও জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে মো. কামরুজ্জামান পাটোয়ারীকে ১ হাজার ৬৫৯ বর্গফুটের ‘সি/৬/এইচ’ বাসা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, ২০২৪ সালের ১ আগস্ট ১৯তম গ্রেডের কর্মচারী ওয়েম্যান (গ্যাং-৪) মো. খায়রুল ইসলামকে ১ হাজার ২২০ বর্গফুটের একটি বাসা বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অথচ প্রাধিকার অনুযায়ী তিনি মাত্র ৪০০ বর্গফুটের বাসা পাওয়ার যোগ্য। অর্থাৎ তাঁর প্রাপ্যতার প্রায় তিনগুণ বড় বাসা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এ ধরনের অনিয়মতান্ত্রিক বরাদ্দের কারণে সরকার বিপুল রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রাপ্যতার ভিত্তিতে বাসা পাওয়ার কথা থাকা জ্যেষ্ঠ ও অন্যান্য কর্মচারীরাও আবাসন সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এসব অনিয়মতান্ত্রিক বরাদ্দের কারণে ডিইএন/৩/ঢাকা দপ্তরের বাসার পুলও শূন্য হয়ে পড়েছে। বর্তমানে ওই দপ্তরের অনুকূলে কোনো সিএস বা সি-টাইপ বাসা অবশিষ্ট নেই বলে তাঁরা অভিযোগ করেছেন। ফলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মচারীদের আবাসন সুবিধা পাওয়ার সুযোগও সংকুচিত হয়েছে।
এ অবস্থায় ভুক্তভোগী কর্মচারীরা সিএস/১৪/এইচ এবং সিএস/১৪/ই কোয়ার্টারের বিতর্কিত বরাদ্দ বাতিল করে সেগুলো ডিইএন/৩/ঢাকা দপ্তরের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, এতে বাসা বরাদ্দে সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
অভিযোগ রয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তৎকালীন এক মন্ত্রীর সুপারিশপত্র বা ডিও লেটারের মাধ্যমে নিজেকে ছাত্রলীগের কর্মী দাবি করে তিনি ঢাকা বিভাগের ডিআরএম পদটি বাগিয়ে নেন। তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি নিজের রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করে বিএনপিপন্থী হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার চেষ্টা করছেন।
অভিযোগকারীরা আরও বলেছেন, রেলওয়েতে সাধারণ বা অধস্তন কোনো কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে যাচাই-বাছাই ছাড়াই তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নজির রয়েছে। অথচ একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও দালিলিক প্রমাণসহ লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরও দীর্ঘ সময় ধরে কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেওয়ায় রেলওয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগের বিষয়ে সাবেক ডিআরএম ও বর্তমান চীফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট (পূর্ব) সফিকুর রহমানের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সংযোগ কেটে দেন। পরে হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলেও তাঁর কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
ভুক্তভোগী কর্মচারীরা অবিলম্বে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র গায়েবের অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে নথিগুলো উদ্ধার, বাসা বরাদ্দের সংশ্লিষ্ট সব ফাইল পর্যালোচনা এবং অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। তবে রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেছেন, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে সরকারি চাকরি বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ২০৪ ধারা—প্রমাণ লোপাট এবং ৩৮১ ধারা—কেরানি বা ভৃত্য কর্তৃক চুরির বিধান অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
এখন ভুক্তভোগী কর্মচারীদের মূল দাবি—বাসা বরাদ্দের পুরো প্রক্রিয়া, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র এবং বিতর্কিত বরাদ্দগুলো নিরপেক্ষ তদন্তের আওতায় এনে প্রকৃত ঘটনা বের করে আনা। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা অভিযোগের নিষ্পত্তি এবং সরকারি গুরুত্বপূর্ণ নথি গায়েবের রহস্য উদ্ঘাটনের মাধ্যমে রেলওয়ের আবাসন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
বিস্তারিত আসছে পরবর্তী ২য় পর্বে….