রেল কর্মকর্তা জিনিয়াকে ফাঁসানোর ছক! সিপিওর স্বাক্ষর জাল করে চিঠি

বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চিফ কমার্শিয়াল ম্যানেজার (সিসিএম) দফতরের কর্মকর্তা সিটিআই (গ্রেড-১) জিনিয়া নাসরিনের বিরুদ্ধে সরকারি চাকরিতে তথ্য গোপন করে নিয়োগ, দ্বৈত পেশায় যুক্ত থাকা, সরকারি দক্ষতা ও শৃঙ্খলা লঙ্ঘন এবং পেশাগত আচরণ ও শিষ্টাচার লঙ্ঘনের অভিযোগের আইনগত মতামত গ্রহণকে ঘিরে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে।

অভিযোগ রয়েছে, এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের সলিসিটর অনুবিভাগের (ফৌজদারি শাখা) কাছে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চিফ পার্সোনাল অফিসার (সিপিও) দফতর থেকে সাবেক সিপিও তরুণ কান্তি বালার জাল স্বাক্ষরযুক্ত একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। ওই চিঠিতে অভিযোগকারী পক্ষের বক্তব্য উল্লেখ করা হলেও অভিযুক্তের দাখিল করা কাগজপত্র ও বক্তব্য যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হয়নি।

সিনিয়র সহকারী সচিব (ফৌজদারি) মো. নাসির উদ্দিন খান স্বাক্ষরিত আইন ও বিচার বিভাগের সলিসিটর অনুবিভাগের (ফৌজদারি শাখা) একটি চিঠি রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপকের (জিএম) কাছে পাঠানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সুনির্দিষ্ট আইনগত মতামত প্রদানের জন্য বিষয়টি সলিসিটর অনুবিভাগে পাঠানো হলেও সেখানে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সিপিও দফতর থেকে পাঠানো চিঠির বৈধতা ও তথ্য উপস্থাপনের ধরন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, নিয়ম অনুযায়ী কোনো বিষয়ে আইনগত মতামতের জন্য সলিসিটর অনুবিভাগে নথি পাঠানোর ক্ষেত্রে অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত—উভয় পক্ষের দাখিল করা কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে পূর্ণাঙ্গ তথ্যসহ তা উপস্থাপন করার কথা। কিন্তু সলিসিটর অনুবিভাগে দাখিল করা চিঠিতে শুধু অভিযোগকারী লিখি বেগমের অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। অভিযুক্ত জিনিয়া নাসরিনের পক্ষে রেলওয়ে প্রশাসনের কাছে দাখিল করা কাগজপত্র, প্রত্যয়নপত্র এবং পূর্ববর্তী আইনগত মতামতের বিষয়গুলো সেখানে যথাযথভাবে উল্লেখ করা হয়নি।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো, সলিসিটর অনুবিভাগে পাঠানো ওই চিঠিতে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সাবেক সিপিও তরুণ কান্তি বালার স্বাক্ষর ব্যবহার করা হলেও তিনি নিজেই ওই স্বাক্ষরকে জাল বলে দাবি করেছেন।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সদ্য অব্যবহি প্রাপ্ত সিপিও তরুণ কান্তি বালা বলেন, “আমি কোনো চিঠি জমা দেইনি। সলিসিটর উইংয়ে পাঠানো আমার স্বাক্ষরিত চিঠিটি সম্পূর্ণ ভুয়া। তা ছাড়া সলিসিটর উইংয়ে চিঠি পাঠানো আমার কাজ নয়। এটি রেল মন্ত্রনালয়ের আইন বিভাগের মাধ্যমে পাঠাতে হয়। আমি বলবো, এটা জালিয়াতি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট চিঠির কপির স্বাক্ষর দেখে আমি ১০০ শতাংশ শিওর দিয়ে বলবো, এই স্বাক্ষরটি আমার না। এটি কলম দিয়ে বারবার কাটাকাটি করে ঘষে ঘষে তৈরি করা হয়েছে। স্বাক্ষরটি অস্পষ্ট এবং কাটাকাটিতে বোঝাই যাচ্ছে এটি নকল। আমি বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানাবো।”

অনুসন্ধানে জানা যায়, মূল ঘটনাটির সূত্রপাত চট্টগ্রামের সিআরবিতে কর্মরত রেলওয়ের কর্মী মাকসুদা আক্তার লিখি ও তার স্বামী মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে জিনিয়া নাসরিনের ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে। এ দ্বন্দ্বের জেরে জিনিয়া নাসরিনের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ দায়ের করা হয়।

অভিযোগে বলা হয়, সরকারি চাকরির পাশাপাশি তিনি আইন পেশায় নিয়োজিত থেকে দ্বৈত পেশায় যুক্ত রয়েছেন। একই সঙ্গে সরকারি চাকরিতে তথ্য গোপন করে নিয়োগ, সরকারি দক্ষতা ও শৃঙ্খলা লঙ্ঘন এবং পেশাগত আচরণ ও শিষ্টাচার লঙ্ঘনের অভিযোগও তোলা হয়।

তবে অভিযোগের পর জিনিয়া নাসরিন চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি থেকে দুটি প্রত্যয়নপত্র সংগ্রহ করে রেলওয়ে প্রশাসনের কাছে জমা দেন। ওই প্রত্যয়নপত্রে উল্লেখ করা হয়, তিনি কখনো আইন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন না। অভিযোগের জবাবে তিনি প্রয়োজনীয় সব বৈধ কাগজপত্রও রেলওয়ে প্রশাসনের কাছে দাখিল করেন।

এর পরিপ্রেক্ষিতে রেলওয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে একজন ওয়েলফেয়ার ইন্সপেক্টরকে দিয়ে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতিতে সরেজমিনে অভিযোগের বিষয়ে যাচাই-বাছাই করা হয়। যাচাই-বাছাইয়ের পর তৎকালীন রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) সুবক্তগীনের নির্দেশে একজন ব্যারিস্টারের আইনগত মতামতের জন্য পাঠানো হয়।

ব্যারিস্টারের লিখিত আইনগত মতামতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, জিনিয়া নাসরিন দ্বৈত পেশায় যুক্ত থাকার মতো কোনো অপরাধ করেননি এবং সরকারি চাকরি বিধিমালার কোনো লঙ্ঘনও ঘটেনি। অর্থাৎ অভিযোগের বিপরীতে প্রাপ্ত আইনগত মতামতে তার বিরুদ্ধে দ্বৈত পেশায় যুক্ত থাকার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি বলে মত দেওয়া হয়।

ব্যারিস্টারের ওই আইনগত মতামতের সঙ্গে একমত পোষণ করে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের আইন কর্মকর্তা আল মাহমুদ ২০২৫ সালের ৯ অক্টোবর সিপিও (পূর্ব) ও জিএম (পূর্ব)-এর কাছে একটি পত্র প্রেরণ করেন। পরে জিএম (পূর্ব) ও সিপিও (পূর্ব) প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিলে সিপিওর জেনারেল শাখা থেকে সংশ্লিষ্ট নথি উপস্থাপন করা হয়।

সংশ্লিষ্ট নথির নম্বর ৫৪.০১.১৫০০.১১৪.০৫.০০১.২৫। রেজিস্ট্রার খাতার এন্ট্রি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর নথিটি সিপিওর কাছে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু এরপর প্রায় ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও সিপিও তরুণ কান্তি বালা নথিটিতে কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত, নির্দেশনা কিংবা নিষ্পত্তি করেননি বলে অভিযোগ রয়েছে।

এরই মধ্যে নথিটি রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে যায়। সরকারি দফতর থেকে নথি গায়েবের ঘটনা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হলেও এখন পর্যন্ত সিপিও দফতর থেকে কোনো প্রকার ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি এবং বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছেও লিখিতভাবে জানানো হয়নি বলে জানা গেছে।

এদিকে প্রশ্ন উঠেছে, রেলওয়ের নিজস্ব যাচাই-বাছাই, চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির দুটি প্রত্যয়নপত্র, সরেজমিন তদন্ত এবং ব্যারিস্টারের আইনগত মতামত থাকার পরও কেন সলিসিটর অনুবিভাগে শুধু অভিযোগকারীর বক্তব্য তুলে ধরে চিঠি পাঠানো হলো? একই সঙ্গে যে নথির ভিত্তিতে পূর্বের প্রক্রিয়াটি এগিয়েছিল, সেটিই বা কীভাবে উধাও হলো—এমন প্রশ্ন সচেতন মহলের।

এ বিষয়ে ভুক্তভোগী রেল কর্মকর্তা ও সিটিআই (গ্রেড-১) জিনিয়া নাসরীন বলেন, “প্রথমে সিপিও দপ্তর থেকে আমার সংশ্লিষ্ট নথিটি গায়েব করে দেওয়া হয়। অথচ ওই নথিতেই দীর্ঘ যাচাই-বাছাই ও তদন্ত শেষে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছিল যে, আমি নির্দোষ। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ঠিক সেই সময়েই নথিটি সরিয়ে ফেলা হয়। এরপর আবার সিপিও স্যারের স্বাক্ষর জাল করে আমার বিরুদ্ধে একতরফাভাবে একটি অভিযোগ সলিসিটরের কাছে দাখিল করা হয়েছে। অর্থাৎ, প্রথমে নথি গায়েব করে এবং পরবর্তীতে স্বাক্ষর জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে আমাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু মিথ্যা ও ষড়যন্ত্র দিয়ে সত্যকে দীর্ঘদিন চাপা দিয়ে রাখা যায় না। কে বা করা করেছে এটি রেলওয়েতে অনেকরই জানা। শুধু আমার সাথেই নয়, তারা রেলওয়ের অনেকের সাথেই এমন করেছে। যারা অন্যায় করেছে, তারা বারবার সত্যের কাছে পরাজিত হয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, শেষ পর্যন্ত সত্যই প্রতিষ্ঠিত হব।

অভিযোগকারীর পক্ষ থেকে প্রতিহিংসামূলকভাবে একতরফা তথ্য উপস্থাপনের মাধ্যমে জিনিয়া নাসরিনকে হয়রানি করা হচ্ছে কি না, সলিসিটর উইংয়ে পাঠানো চিঠিতে কারা সাবেক সিপিওর স্বাক্ষর জাল করেছে এবং রেলওয়ের গুরুত্বপূর্ণ নথি উধাও হওয়ার পেছনে কারও দায় রয়েছে কি না—এসব বিষয়ে তদন্তের দাবিজানিয়েছেন ভুক্তভোগী রেল কর্মকর্তা।

একই সঙ্গে সরকারি দফতরের গুরুত্বপূর্ণ নথিতে একজন সাবেক সিপিওর স্বাক্ষর জাল করে তা আইন মন্ত্রণালয়ের সলিসিটর অনুবিভাগে পাঠানোর অভিযোগটি সত্য হলে এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সেটিও এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আরও পড়ুন