রেলওয়ের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকার কথা। দায়িত্ব রেলসম্পদ রক্ষা, অপরাধ দমন ও রেলওয়ের স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অথচ সেই দায়িত্ব পালন নিয়ে প্রশ্ন ওঠা রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) সিপাহি মো. পারভেজ খানকে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাউবি) পরীক্ষার হলে। রেলওয়ের দায়িত্ব পালনে অনিয়মের অভিযোগে প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশের পরও তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেয়নি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
অনুসন্ধানে পাওয়া অভিযোগ অনুযায়ী, ২০০৪ সালে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীতে (আরএনবি) যোগ দেন পারভেজ খান। এরপর থেকেই তিনি কথিত ‘ভগবান ডিউটি’ করে আসছেন। মাসে মাত্র ৪-৫ হাজার টাকা দিয়ে সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে দায়িত্ব পালন না করেও সরকারি বেতন-ভাতা ভোগ করছেন তিনি। চট্টগ্রাম পাহাড়তলী স্টেশনে দায়িত্বে থাকাকালেও তার ডিউটি ছিল মূলত কাগজে-কলমে। রেলওয়ের বিশেষ অভিযান বা কোনো আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম থাকলে মাঝেমধ্যে উপস্থিত হয়ে ফটোশ্যুটে অংশ নিলেও নিয়মিত দায়িত্ব পালনে তার উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এবার বাউবির পরীক্ষার হলে পারভেজ খানের উপস্থিতি সামনে আসায় প্রশ্ন উঠেছে, রেলওয়ের দায়িত্ব পালন না করে অন্য প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে যুক্ত থাকার সুযোগ তিনি কীভাবে পাচ্ছেন? সংশ্লিষ্ট সময়ে তার রেলওয়ের ডিউটি ছিল কি না, পরীক্ষার হলে কী দায়িত্ব পালন করেছেন এবং এ জন্য কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছিল কি না—এসব তথ্য যাচাইয়ের দাবি উঠেছে। কারণ, নির্ধারিত দায়িত্ব পালন না করেও হাজিরা বহাল রাখার অভিযোগ সত্য হলে তা সরকারি চাকরির শৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রীয় অর্থের যথাযথ ব্যবহারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
সিপাহি পরিচয়ের আড়ালে একাধিক পরিচয়
অভিযোগ রয়েছে, রেলওয়ের সিপাহি হলেও এলাকায় নিজেকে কখনো বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা, কখনো সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দেন পারভেজ খান। তার ব্যক্তিগত সুজুকি জিক্সার মোটরসাইকেল ও লাল রঙের প্রাইভেটকারে লাগানো রয়েছে ‘PRESS’ স্টিকার। জানা যায়, তিনি বাউবি-সংশ্লিষ্ট ‘ডাক দিয়ে যাই’ সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়টির একটি আঞ্চলিক দায়িত্বে কাজ করার কথাও উঠে এসেছে। অতীতে তিনি মহসিন কলেজের সাবেক ভিপি ছিলেন এবং নিজেকে আওয়ামী লীগের বড় নেতা হিসেবে পরিচয় দিতেন।
সরকারি বাসায় ভর্তি কেন্দ্র, কোচিং সেন্টার; বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়েও অভিযোগ
সরজমিনে দেখা যায়, সরকারি বাসা বরাদ্দ নিয়ে সেখানে চাকরির নিয়ম ভেঙে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি কেন্দ্র ও কোচিং সেন্টার খুলেছেন তিনি। সেখানে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণযন্ত্র (এসি) চালানো হলেও বিদ্যুতের সংযোগ নেওয়া হয়েছে পিডিবির বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে সরাসরি অবৈধ লাইনের মাধ্যমে। ফলে ওই বিদ্যুৎ ব্যবহারেী বিল সরাসরি সরকারি অর্থের অপচয় হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
পারভেজের দাবি, নিয়মিত ডিউটি করেন
এসব অভিযোগের বিষয়ে সিপাহি মো. পারভেজ খান বলেন, “আমি প্রতিনিয়ত ডিউটি পালন করছি এবং চোর ধরতে গিয়ে আমার তিনটি ইউনিফর্ম ছিঁড়েছে। সাংবাদিক পরিচয়ের ব্যাপারে বলব, আমার ১৪ গোষ্ঠী ও পরিবারের সবাই সাংবাদিক, সে হিসেবে মানুষ সাংবাদিক মনে করে। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ও কোচিংয়ের বিষয়ে সরকারি চাকরিতে নিয়ম আছে—শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি এই তিনটি কাজ করতে পারব। তাছাড়া আমার স্ত্রী উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষিকা। বাকি সকল অভিযোগ ভিত্তিহীন।”
অভিযোগের কথা জানেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ব্যবস্থা কোথায়?
রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আগে জানিয়েছিলেন, পারভেজ খানের ‘ভগবান ডিউটি’র বিষয়টি তারা অবগত। তার বিরুদ্ধে আগেও নানা অভিযোগ শুনেছেন বলে জানান ওই কর্মকর্তা। তবে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরেন তিনি। তার বক্তব্য, সংবাদ প্রকাশ করলে এ ধরনের দায়িত্বে অনিয়মের অভিযোগ থাকা অন্য সদস্যদের বিষয়েও প্রতিবেদন করা উচিত।
অন্যদিকে, এসআরবি স্টেশনের দায়িত্বে থাকা চিফ ইন্সপেক্টর (সিআই) আমিনুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, ভগবান ডিউটি করার সুযোগ নেই। বিষয়টি খতিয়ে দেখে বাহিনীর নিয়ম অনুযায়ী ব্যাবস্থা নেওয়া হবে।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা বাহিনীর প্রধান চিফ কমান্ড্যান্ট জহিরুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।