জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে: পানি সম্পদমন্ত্রী

চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে চলমান প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের পাশাপাশি প্রকল্প-পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণ, খাল-নালা ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার আন্তঃসংযোগ এবং সিটি কর্পোরেশনের কার্যকর সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মোঃ শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি এমপি।

মঙ্গলবার বিকালে টাইগারপাসস্থ চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে করণীয় নির্ধারণে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

পানি সম্পদমন্ত্রী বলেন, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন যে উদ্যোগ নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও কর্মকর্তাদের একসঙ্গে আলোচনায় বসার সুযোগ তৈরি করেছেন, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জলাবদ্ধতা নিরসনের মতো একটি জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় থাকা প্রয়োজন। এ উদ্যোগের জন্য তিনি মেয়রকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানান।

তিনি বলেন, চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে যে প্রকল্প চলমান রয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই হবে না, প্রকল্প শেষ হওয়ার পর সেটি কীভাবে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে, পানি কীভাবে প্রবাহিত হবে এবং ছোট-বড় খাল, ড্রেন ও অন্যান্য জলপ্রবাহের মধ্যে কীভাবে কার্যকর সংযোগ থাকবে—এসব বিষয়ও পরিকল্পনার শুরুতেই বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন ছিল।

মন্ত্রী বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন সংস্থা জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করছে। কিন্তু সিটি কর্পোরেশনকে শুরু থেকেই সমন্বিতভাবে প্রকল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন ছিল। কারণ প্রকল্প বাস্তবায়নের পর খাল, ড্রেন ও পানি নিষ্কাশন অবকাঠামোর নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, রক্ষণাবেক্ষণ ও দখলমুক্ত রাখার দায়িত্ব কার—তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ না থাকলে বিপুল অর্থ ব্যয় করেও কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে।

তিনি আরও বলেন, কোথাও একটি ড্রেন বা খালের কাজ শেষ হয়েছে, আবার অন্য জায়গায় কাজ চলমান রয়েছে। কোথাও খাল ভরাট হয়ে যাচ্ছে, কোথাও দখল হচ্ছে। এসব বিষয় সমন্বিতভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে। তাই প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতে হবে।

পানি সম্পদমন্ত্রী বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের চলমান কাজগুলো শেষ পর্যায়ে রয়েছে। কয়েকটি খালের কাজ এবং সংশ্লিষ্ট রেগুলেটরের কাজ সম্পন্ন হলে পানি প্রবাহের সক্ষমতা আরও বাড়বে। তবে এসব খাল ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার সঙ্গে মহানগরীর ছোট ছোট খাল, নালা ও সংযোগ খালগুলোর আন্তঃসংযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। একটি অংশের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা আরেকটি অংশের সঙ্গে সংযুক্ত না থাকলে কোথাও পানি আটকে থেকে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতে পারে।
তিনি বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে এখন একটি সমন্বিত রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে এ কাজে কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে। প্রয়োজন হলে সিটি কর্পোরেশনের জন্য অতিরিক্ত বরাদ্দ, জনবল ও প্রয়োজনীয় সক্ষমতার ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ প্রকল্প শেষ হওয়ার পর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না হলে কয়েক বছর পর আবার একই সমস্যা দেখা দিতে পারে।

মন্ত্রী বলেন, সিটি কর্পোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে ভবিষ্যৎ রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার একটি কার্যকর কাঠামো তৈরি করতে হবে। জলাবদ্ধতা নিরসনে সবাই যদি সতর্ক ও দায়িত্বশীলভাবে কাজ করে, তাহলে চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

মেয়র বলেন, চট্টগ্রামে এ বছর একদিনে ৪১২ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়েছে। এর আগে ২০০৭ সালে একদিনে ৪০৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছিল। ওই সময় পাহাড়ধসসহ বিভিন্ন ঘটনায় বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল। এ বছর বিপুল পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই নগরীর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, অতিবৃষ্টির পাশাপাশি পাহাড়ি ঢল ও পাহাড় কাটার কারণে সৃষ্ট মাটি-বালু খাল ও নালা ভরাট হয়ে যাওয়াও জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ। এসব বিষয়কে সমন্বিতভাবে বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দিকে যেতে হবে।

মেয়র বলেন, নগরীর প্রায় ৪০টি খাল নিয়ে সিটি কর্পোরেশনের একটি ডিপিপি রয়েছে। পাশাপাশি সেনাবাহিনীর বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পের আওতায়ও বেশ কিছু খালের সংস্কার ও পুনঃখননের কাজ চলছে। যেসব খাল সেনাবাহিনীর প্রকল্পের আওতায় রয়েছে, সেগুলো তারা করবে এবং অন্যান্য খালের কাজ সিটি কর্পোরেশন করবে। এসব কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন করা গেলে জলাবদ্ধতা নিরসনে ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে বলে আমরা আশা করছি।

তিনি বলেন, হিজড়া খালসহ কয়েকটি খালের কিছু কাজ এখনো বাকি রয়েছে। বৈশাখ মাসে চট্টগ্রামে যে পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে, তা ছিল অস্বাভাবিক। এত অল্প সময়ে এত বেশি বৃষ্টি হবে—এটা অনেকেরই ধারণার বাইরে ছিল। ফলে প্রবর্তক মোড়ে সেসময় সেনাবাহিনীর প্রকল্পে জন্য বাঁধ থাকায় কিছু এলাকায় হঠাৎ করে পানি জমেছিল। তবে এটিকে পুরো বছরের জলাবদ্ধতার চিত্র হিসেবে দেখলে চলবে না। গত বছরের তুলনায় অনেক এলাকায় পানি জমার সময় ও স্থায়িত্ব কমেছে—এটিও আমাদের অগ্রগতির অংশ।

চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ এমপি বলেন, চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে বড় খাল সংস্কার ও সুইসগেট নির্মাণের পাশাপাশি ছোট নালা ও খালগুলোর সঙ্গে কার্যকর সংযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ বড় খালগুলো সংস্কার করলেও পানি যদি ছোট নালা থেকে খালে পৌঁছাতে না পারে, তাহলে জলাবদ্ধতা নিরসন সম্ভব হবে না।

এরশাদ উল্লাহ এমপি বলেন, চট্টগ্রাম-৮, ৯, ১০ ও ১১ সংসদীয় এলাকার সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে মেয়র যে কমিটিগুলো গঠন করেছেন, সেসব কমিটির সুপারিশ নিয়ে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যদের সঙ্গে বসে সমন্বিতভাবে করণীয় নির্ধারণ করা প্রয়োজন। শুধু বড় খাল পরিষ্কার, সংস্কার বা সুইসগেট নির্মাণ করলেই জলাবদ্ধতা নিরসন হবে না; ছোট নালা থেকে বড় খাল এবং সেখান থেকে নদী পর্যন্ত পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে।

চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান বলেন, চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে বিচ্ছিন্নভাবে কোনো একটি খাল বা নালা সংস্কার করলে হবে না; পুরো পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। খাল সংস্কারের পাশাপাশি নালাগুলো সচল রাখা এবং ছোট খালগুলোর সঙ্গে বড় খালের কার্যকর সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে তিনি দেখেছেন, চট্টগ্রাম ১০ আসনে ৪টি খালের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এসব খালকে কীভাবে আরও কার্যকর করা যায় এবং মহেশখালের সঙ্গে কীভাবে যথাযথভাবে সংযুক্ত করা যায়, সে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। মহেশখাল দীর্ঘ ও প্রশস্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ জলপ্রবাহ ব্যবস্থা হলেও এর সক্ষমতা ও অবকাঠামোকে এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।

সভায় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে সিডিএর চলমান প্রকল্পের আওতায় ৩৬টি খালের সংস্কার ও পুনরুদ্ধারের কাজ করা হচ্ছে। এসব কাজ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বিপুলসংখ্যক স্থাপনা উচ্ছেদ করতে হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৫ হাজার ৭০০টি বৈধ ও অবৈধ স্থাপনা অপসারণ করা হয়েছে। এখনো কয়েকটি স্থাপনা অপসারণ বাকি রয়েছে, যেগুলোও অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং।

তিনি বলেন, চট্টগ্রামের পাহাড়, খাল ও প্রাকৃতিক জলপ্রবাহের ওপর দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো ও স্থাপনা গড়ে ওঠার কারণে নগরীর স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে খালগুলো পুনরুদ্ধার ও সংস্কারের যে কাজ করা হচ্ছে, তা সহজ কোনো কাজ নয়। সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ এবং মাঠপর্যায়ে কঠোরভাবে কাজ করার কারণেই এসব কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে।

সভায় আরো বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম মো. জানে আলম, অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার নুসরাত সুলতানা, অতিরিক্ত পুুলিশ কমিশনার হোসাইন মোহাম্মদ কবির ভূইয়া, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের পরিচালক কর্ণেল তারিকসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা। মতবিনিময় সভায় চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে চলমান বিভিন্ন প্রকল্পের অগ্রগতি, খাল ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার বর্তমান অবস্থা, পানি নিষ্কাশনের প্রতিবন্ধকতা, খাল দখল ও ভরাট, রেগুলেটর ব্যবস্থাপনা এবং প্রকল্প-পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিরা তাদের নিজ নিজ কার্যক্রম ও সমস্যার কথা তুলে ধরেন।

আরও পড়ুন