রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের (বিএসসি) নাবিক নিয়োগ বাণিজ্য, পদোন্নতিতে ঘুষ, জাহাজ মেরামতের নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
এসব অভিযোগে বিএসসির নির্বাহী পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ ইউসুফ, মহাব্যবস্থাপক (চলতি দায়িত্ব) মো. জিয়াউর রহমানসহ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দেন সংস্থাটিরই মহাব্যবস্থাপক (দূরপ্রাচ্য ও পশ্চিম এশিয়া) মো. আতাউর রহমান।
অভিযোগ পাওয়ার পর ২০২৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় একজন যুগ্মসচিবকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করে। প্রায় ১০ মাস পর সেই তদন্তের অংশ হিসেবে আগামীকাল ২৯ জুলাই শুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। ওই শুনানিতে অভিযুক্ত কর্মকর্তা, অভিযোগকারী এবং অভিযোগে নাম থাকা অন্যদের লিখিত বক্তব্য ও প্রমাণাদিসহ উপস্থিত থাকতে নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ:
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, নির্বাহী পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ ইউসুফ এবং তৎকালীন জাহাজ মেরামত বিভাগের কর্মকর্তা বর্তমানে শিপ পার্সোনেল বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মো. জিয়াউর রহমান যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার করে সংস্থার একজন স্থায়ী প্রধান প্রকৌশলীকে (চিফ ইঞ্জিনিয়ার) প্রায় এক বছর ‘অন-স্টাফ’ হিসেবে অফিসে বসিয়ে রাখেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, ওই সময় ঘুষের বিনিময়ে ছয়জনকে চুক্তিভিত্তিক চিফ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে দুজনের মাসিক বেতন ১২ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার এবং চারজনের ১২ হাজার মার্কিন ডলার নির্ধারণ করা হয়। অভিযোগকারী দাবি করেছেন, বিধি অনুযায়ী কোনো জাহাজী কর্মকর্তাকে তিন মাসের বেশি অন-স্টাফ রাখার সুযোগ নেই। অথচ তা লঙ্ঘন করে মেয়াদ বাড়ানো হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, এতে একদিকে স্থায়ী কর্মকর্তার বেতন বাবদ সংস্থার ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৪ লাখ ৭০ হাজার টাকা, অন্যদিকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে বছরে ব্যয় হয়েছে প্রায় এক লাখ ২০ হাজার মার্কিন ডলার। ফলে সংস্থার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, ঘুষের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া অদক্ষ কর্মকর্তাদের কারণে বিদেশি বন্দরে বিএসসির জাহাজ জরিমানা ও ডিমেরিট পয়েন্টের মুখে পড়ছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে জাহাজ উচ্চমূল্যে চার্টার দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কয়েক মাস আগে একটি জাহাজ দুর্ঘটনায় পড়ার পর সেটি উদ্ধারে প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
পদোন্নতিতে ঘুষের অভিযোগ
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি বিএসসি মেরিন ওয়ার্কশপের অপারেটিভ কর্মচারীদের পদোন্নতি কমিটির সভার আগে বিধিবহির্ভূতভাবে একটি বাছাই উপকমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন নির্বাহী পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ ইউসুফ।
অভিযোগ অনুযায়ী, অধিক যোগ্য গ্র্যাজুয়েট ও ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের বাদ দিয়ে অষ্টম শ্রেণি ও মাধ্যমিক পাস কয়েকজন কর্মচারীকে পদোন্নতির সুপারিশ করা হয়। এতে বিএসসির চাকরি প্রবিধানমালা ও পদোন্নতি নীতিমালা লঙ্ঘন করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, পদোন্নতি পাওয়া এক কর্মচারী এক লাখ ৫০ হাজার টাকা ঘুষ দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। অভিযোগকারী দাবি করেছেন, সেই স্বীকারোক্তি মোবাইল ফোনে রেকর্ড করেন বিএসসির এক সুপারিনটেনডেন্ট, যা পরে ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও শোনানো হয়। তবে এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
জাহাজ মেরামতে কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ
অভিযোগে বলা হয়েছে, জাহাজ মেরামত বিভাগে পছন্দের ঠিকাদারের মাধ্যমে অতিমূল্যে যন্ত্রাংশ ও মেরামতকাজ দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
পরিবহন অডিট অধিদপ্তরের একটি অডিট আপত্তির উদ্ধৃতি দিয়ে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, মেরামতের অযোগ্য দুটি জাহাজ—এমটি বাংলার জ্যোতি ও এমটি বাংলার সৌরভ—মেরামতের নামে ৫ কোটি ৬৬ লাখ ৭৬ হাজার ৯২৭ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে।
এসবের নেপথ্যেও নির্বাহী পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ ইউসুফ এবং তৎকালীন জাহাজ মেরামত বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মো. জিয়াউর রহমান।
অভিযোগকারী আরও দাবি করেছেন, বিএসসির বিভিন্ন বিভাগে অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ চলছে। এসব বিষয়ে গণমাধ্যমকে তথ্য প্রকাশ না করতে প্রশাসনিক বাজেট থেকে অর্থ ব্যয়েরও অভিযোগ আনা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, বিএসসির নির্বাহী পরিচালক (প্রযুক্তি) পদ দীর্ঘ প্রায় আট বছর এবং নির্বাহী পরিচালক (অর্থ) পদ পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে শূন্য রয়েছে। এই সুযোগে চলতি দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন এবং প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে।
তদন্তে ডেকেছে মন্ত্রণালয়
অভিযোগ পাওয়ার পর ২০২৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় যুগ্মসচিব (জাহাজ) মোহাম্মদ এমরান হোসেনকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করে। তাঁকে অভিযোগ তদন্ত করে তৎকালীন সিনিয়র সচিবের কাছে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়।
সর্বশেষ গত ১৫ জুলাই জারি করা এক নোটিশে তদন্ত কর্মকর্তা ২৯ জুলাই সকাল ১১টায় মন্ত্রণালয়ে শুনানির তারিখ নির্ধারণ করেন। নোটিশে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে সংশ্লিষ্টদের লিখিত বক্তব্য ও স্বপক্ষের প্রমাণাদিসহ উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে।
শুনানিতে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে বিএসসির নির্বাহী পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ ইউসুফ, অভিযোগকারী মহাব্যবস্থাপক মো. আতাউর রহমান, মহাব্যবস্থাপক (চলতি দায়িত্ব) মো. জিয়াউর রহমান চৌং, রেকর্ড কিপার ও সিবিএ নেতা মো. আতিকউর রহমান এবং মেরিন ওয়ার্কশপের ফোরম্যান ও সিবিএ নেতা মো. নাজমুল আহসানকে।