দেশের রেল সম্পদ রক্ষা এবং অপরাধ দমনের মূল দায়িত্বে থাকা রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী (আরএনবি) এখন নিজেই অপরাধ ও দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে চলা ক্ষমতার অপব্যবহার ও বদলি বাণিজ্য এখন সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।
অভিযোগ উঠেছে, খোদ পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) এবং আরএনবি প্রধান জহিরুল ইসলামের প্রত্যক্ষ যোগসাজশ ও আর্থিক স্বার্থে একের পর এক বিতর্কিত বদলি কার্যকর করা হচ্ছে। রেলের এই নিরাপত্তা শাখায় বর্তমানে চাকা খরচ অর্থাৎ মোটা অঙ্কের উপরি টাকা দিলেই মিলছে অবলীলায় সুবিধাজনক ও লাভজনক স্থানে পোস্টিং। এসব অনিয়ম নিয়ে একের পর এক সংবাদ প্রকাশিত হলেও রেলওয়ে প্রশাসন সম্পূর্ণ নির্বিকার, বরং গুঞ্জন রয়েছে যে দলীয় বড় নেতাদের সুপারিশ ও লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে এই বাহিনীতে পদায়ন ও বদলি নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।
এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল ‘জেনারেল শাখা’ ও ‘অস্ত্র শাখায়’ দুই বিতর্কিত হাবিলদারকে পদায়ন করা হয়েছে, যা সচেতন মহলকে চরমভাবে ক্ষুব্ধ করেছে। এর মধ্যে জেনারেল শাখার মতো সংবেদনশীল জায়গায় পোস্টিং দেওয়া হয়েছে হাবিলদার জসিম উদ্দিন সরকারকে, যার বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে গণমাধ্যমে ‘ডাকাত জসিম’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। ওই গুরুতর অভিযোগের ভিত্তিতে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করলেও, সেই তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই অদৃশ্য এক উপর মহলের সুপারিশে ও আর্থিক লেনদেনে তাকে এই গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারে বসানো হয়।
অন্যদিকে আরএনবি’র অতি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা অস্ত্র শাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে হাবিলদার শোয়াইবকে, যার অতীত অপরাধের রেকর্ড আরও ভয়ংকর। ২০১২ সালে সীতাকুণ্ড মডেল থানায় একটি মাদক মামলায় জড়িয়ে চাকরিচ্যুত হওয়া এই শোয়াইব, ২০১৮ সালে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফের ভাতিজা পরিচয়ে মামলা চলাকালীন সময়ে হাবিলদার পদ বাগিয়ে নেন।
গত সাত বছর ধরে এই রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল বানিয়ে চট্টগ্রাম নতুন স্টেশন, পুরাতন স্টেশন, মাদক স্পট ও টিকেট কালোবাজারি চক্র নিয়ন্ত্রণ করে মিরসরাই এলাকায় অগাধ অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন তিনি। ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর আত্মগোপনে যাওয়ার জন্য তিনি ষোলশহর স্টেশনকে বেছে নেন। সেখানে বদলি নিলেও বদলি তার চাঁদাবাজি থামেনি। ষোলশহর, ২ নম্বর গেট, অক্সিজেন ও মুরাদপুর রেলগেটের আশপাশের দোকানপাট থেকে সিপাহী আশীষ বড়ুয়াকে নিজের ‘ক্যাশিয়ার’ বানিয়ে লাখ লাখ টাকা মাসোহার তোলার সুনির্দিষ্ট তথ্য উঠে এসেছে বিভিন্ন প্রতিবেদনে।
গুরুতর অপরাধের বিভাগীয় তদন্ত চলাকালীন এবং মাদক মামলার অন্ধকার রেকর্ড মাথায় থাকার পরও কীভাবে চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও স্ট্র্যাটেজিক পয়েন্টে এদের পদায়ন করা হলো এমন প্রশ্ন সচেতন মহলের।
অপরাধ দমনের দায়িত্বে থাকা সংস্থাই যখন অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়, তখন রেলের সাধারণ যাত্রী ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের নিরাপত্তা সম্পূর্ণ হুমকিতে পড়ে।
এই প্রকাশ্য দুর্নীতির বিষয়ে জানতে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক ও আরএনবি প্রধানের কার্যালয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো সদুত্তর মেলেনি, যা এই পুরো চক্রের নীরব সায়কে আরও স্পষ্ট করে তোলে।