সংগ্রাম ভালবাসা মানবিকতার মিশেলে অনন্য জনপদ “কুতুবদিয়া“

নাজমুল হুদা সাকিব:: বঙ্গোপসাগরের বুক চিরে জেগে ওঠা একটা ছোট্ট দ্বীপ, নাম তার কুতুবদিয়া। কক্সবাজার জেলা সদর থেকে প্রায় ৮৬ কিলোমিটার উত্তর পশ্চিমে অবস্থিত এই দ্বীপটার পরিচয় শুধু লবণ, ঝড় কিংবা উপেক্ষিত জনপদ দিয়ে বোঝানো যাবে না। এখানে ধরা আছে ইতিহাস, আছে ভালোবাসা, আছে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এক অদম্য সংগ্রাম।

ভূতাত্ত্বিক সৃষ্টি: বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় অঞ্চলে নদীর পলল জমে দ্বীপের সৃষ্টি হওয়া একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কুতুবদিয়া দ্বীপের সৃষ্টিও এর ব্যতিক্রম নয়।

  • পলল জমা প্রক্রিয়া : গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা নদী প্রবাহের মাধ্যমে প্রচুর পলল বঙ্গোপসাগরে এসে জমা হয়। এই পলল জমে যুগের পর যুগ ধরে উপকূলীয় দ্বীপের সৃষ্টি করে, যার মধ্যে কুতুবদিয়া অন্যতম।
  • ভূমি উত্থান ও সমুদ্র স্রোত : পৃথিবীর ভূত্বকের পরিবর্তন এবং সমুদ্র স্রোতের কারণে কুতুবদিয়া দ্বীপ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্থায়ী ভূখণ্ডে রূপান্তরিত হয়।

অবস্থান ও আয়তন: কুতুবদিয়া উপজেলার আয়তন ২১৫.৮০ বর্গ কিলোমিটার।কক্সবাজার জেলার উত্তর-পশ্চিমাংশে ২১°৪৩´ থেকে ২১°৫৬´ উত্তর অক্ষাংশ থেকে ৯১°৫০´ থেকে ৯১°৫৪´ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ জুড়ে কুতুবদিয়া উপজেলার অবস্থান।
কক্সবাজার জেলা সদর থেকে এ উপজেলার দূরত্ব ৭৫ কিলোমিটার। এর উত্তর, পশ্চিম ও দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে কুতুবদিয়া চ্যানেল, চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী উপজেলা, পেকুয়া উপজেলা ও মহেশখালী উপজেলা।

কুতুব আউলিয়া ও নামকরণ: দ্বীপটির নামকরণ হয় বিখ্যাত সুফি সাধক হজরত কুতুব আউলিয়ার নামে। বিশ্বাস করা হয়, তিনি এই অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের জন্য এসেছিলেন এবং তাঁর স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে এখানে একটি দরগা স্থাপন করা হয়। দ্বীপটির নাম “কুতুবদিয়া” এই ঐতিহাসিক চরিত্রের প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শন।

অন্যদিকে, দীর্ঘদিন ধরে কুতুবদিয়া দ্বীপের গঠন প্রক্রিয়া শুরু হলেও এ দ্বীপ সমুদ্রের বুক থেকে জেগে উঠে চতুর্দশ শতাব্দীর শেষের দিকে। ধারণা করা হয় পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষের দিকে এ দ্বীপে মানুষের পদচারণা। হযরত কুতুবুদ্দীন নামে এক কামেল ব্যক্তি আলী আকবর, আলী ফকির, এক হাতিয়া সহ কিছু সঙ্গী নিয়ে মগ পর্তুগীজ বিতাড়িত করে এ দ্বীপে আস্তানা স্থাপন করেন।

তাছাড়া আরাকান থেকে পলায়নরত মুসলমানেরা চট্টগ্রামের আশেপাশের অঞ্চল থেকে ভাগ্যান্বেষণে উক্ত দ্বীপে আসতে থাকে। জরিপ করে দেখা যায়, আনোয়ারা, বাঁশখালী, সাতকানিয়া, পটিয়া, চকরিয়া অঞ্চল থেকে অধিকাংশ আদিপুরুষের আগমন।

নির্যাতিত মুসলমানেরা কুতুবুদ্দীনের প্রতি শ্রদ্ধান্তরে কুতুবুদ্দীনের নামানুসারে এ দ্বীপের নামকরণ করেন কুতুবুদ্দীনের দিয়া, যা পরবর্তীতে কুতুবদিয়া নামে স্বীকৃতি লাভ করে। দ্বীপকে স্থানীয়ভাবে দিয়া বা ডিয়া বলা হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন এসে এই দ্বীপে বসবাস শুরু করে। বর্তমানে (২০১৭) এই দ্বীপের বয়স ৬০০ বছর পেরিয়ে গেছে। এই দ্বীপের আয়তন প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কমে গেছে এবং এখনও সাগরের ঢেউয়ের প্রভাবে ভেঙ্গে সমুদ্রে পরিণত হচ্ছে সৌন্দর্যের লীলাভূমি সাগরকন্যা কুতুবদিয়া দ্বীপটি।

ইতিহাসে কুতুবদিয়ার গুরুত্বঃইতিহাস বলে, কুতুবদিয়া একসময় বাণিজ্যিক ও ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। এটি বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যের একটি মাধ্যম ছিল।

কুতুবদিয়া দ্বীপের দর্শনীয় স্থান

কুতুবদিয়া চ্যানেল: মাগনামা ঘাট থেকে কুতুবদিয়া দ্বীপে যাবার সময় এই চ্যানেলটি পাড়ি দিতে হবে। শীতকাল ছাড়া বছরের অন্যান্য সময় এটি বেশ উত্তাল থাকে।

কুতুব আউলিয়ার দরবার: কুতুব আউলিয়ার দরবার শরীফ দেখতে আপনাকে যেতে হবে দ্বীপের ধুরং এলাকায়। এই দরবারের প্রতিষ্ঠাতা শাহ আব্দুল মালেক আল কুতুবী ১৯১১ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মৃত্যু বরণ করেন ২০০০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি। প্রতিবছর ৭ ফাল্গুন শাহ আব্দুল মালেক আল কুতুবীর মৃত্যুবার্ষিকীতে হাজার হাজার ভক্তের আগমন ঘটে।

বাতিঘর: বহুবছর আগে সমুদ্রে চলাচলকারী জাহাজেকে পথ দেখাতে কুতুবদিয়ায় একটি বাতিঘর নির্মাণ করা হয়েছিল, ভাটার সময় সেই বাতিঘরের ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়। সমুদ্র সৈকত ধরে উত্তর দিকে গেলে বর্তমানে নির্মিত নতুন বাতিঘর দেখতে পাবেন।

সমুদ্র সৈকত: কুতুবদিয়ায় রয়েছে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্র সৈকত। নির্জন এই সৈকতে পর্যটকের আনাগোনা খুব কম তবে এখানে জেলেদের কর্মব্যস্ততা চোখে পড়ে। সৈকতের প্রধান বৈশিষ্ট হল এখানে প্রচুর গাংচিল ঘুরে বেড়ায়। সূর্যাস্তের দৃশ্য দেখার জন্য আদর্শ জায়গা হচ্ছে কুতুবদিয়া সমুদ্র সৈকত।

বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র: কুতুবদিয়া সমুদ্র সৈকতের দক্ষিণে রয়েছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র। এখানে প্রায় এক হাজার কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়।

লবণ চাষ: শীতকালে কুতুবদিয়ায় লবণ চাষ করা হয়। প্রাকৃতিক উপায়ে লবণ উৎপাদন দেখতে হলে চলে আসতে পারেন কুতুবদিয়ায়।

কুতুবদিয়া: প্রকৃতি, সম্ভাবনা ও সংকট

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে কক্সবাজার জেলার একটি নয়নাভিরাম দ্বীপ হলো কুতুবদিয়া। বঙ্গোপসাগরের বুক চিরে দাঁড়িয়ে থাকা এই দ্বীপটি তার অপরূপ সৌন্দর্য, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং ঐতিহাসিক গুরুত্বের জন্য বিখ্যাত। কিন্তু সম্ভাবনার এ দ্বীপ আজ নানা সমস্যায় জর্জরিত।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্য

কুতুবদিয়ার সৌন্দর্য যেন এক জীবন্ত চিত্রকর্ম। নারকেল গাছের সারি, বিস্তীর্ণ সমুদ্র সৈকত এবং শান্ত প্রাকৃতিক পরিবেশ এটিকে পর্যটকদের কাছে একটি আদর্শ গন্তব্যে পরিণত করেছে। এখানকার বাতাসে সজীবতার স্পর্শ আছে, যা শহুরে কোলাহল থেকে মুক্তির জন্য একটি আদর্শ জায়গা। দ্বীপটি লবণ উৎপাদনের জন্যও বিখ্যাত।

অর্থনৈতিক সম্ভাবনা

  • লবণ শিল্প: কুতুবদিয়ার লবণ উৎপাদন বাংলাদেশের লবণ চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ করে।
  • মৎস্য সম্পদ: বঙ্গোপসাগরের কাছাকাছি হওয়ায় মাছ ধরা এখানকার প্রধান পেশা।
  • পুনঃনবায়নযোগ্য জ্বালানি: দ্বীপটির বাতাস ও সূর্যালোক সৌরশক্তি এবং বায়ুশক্তি উৎপাদনের জন্য সম্ভাবনাময়।

সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট

তবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বিপরীতে কুতুবদিয়ার মানুষ প্রতিনিয়ত নানামুখী সংকটের সম্মুখীন হচ্ছে।

  • ভাঙনের অভিশাপ: সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং নদী ভাঙনের কারণে প্রতি বছর কুতুবদিয়ার ভূমি সংকুচিত হচ্ছে। অনেক মানুষ তাদের বসতভিটা হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়ছে।
  • পরিবহন সমস্যা: মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সহজ যোগাযোগের অভাবে এখানকার মানুষ অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়ছে।
  • প্রশাসনিক উদাসীনতা: কুতুবদিয়ার উন্নয়নে যথাযথ উদ্যোগের অভাব স্পষ্ট। অবকাঠামো উন্নয়ন ও জনগণের জীবনমান উন্নয়নে অনেক কিছু করার প্রয়োজন।
  • শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা: দ্বীপটির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং স্বাস্থ্যসেবার মান অত্যন্ত নিম্ন। শিক্ষার সুযোগ সীমিত এবং স্বাস্থ্যসেবার জন্য পর্যাপ্ত হাসপাতাল বা ক্লিনিক নেই।

সমাধান ও উদ্যোগ

  • ভাঙন প্রতিরোধ: টেকসই বাঁধ নির্মাণ এবং সমুদ্রের ভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
  • পরিবহন উন্নয়ন: দ্বীপের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের সহজ যোগাযোগের জন্য সেতু বা উন্নত ফেরি সার্ভিস চালু করা যেতে পারে।
  • পুনর্বাসন: বাস্তুচ্যুত মানুষদের জন্য উপযুক্ত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা জরুরি।
  • অর্থনৈতিক কার্যক্রম: লবণ শিল্প ও মৎস্য সম্পদ ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং পুনঃনবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা কাজে লাগানো দরকার।
  • শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন: শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে নতুন প্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য আধুনিক হাসপাতাল স্থাপন প্রয়োজন।

উপসংহার

কুতুবদিয়া একটি সম্ভাবনাময় দ্বীপ, যা সঠিক উদ্যোগ ও পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এই দ্বীপটিকে টিকিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন প্রশাসনের আন্তরিকতা ও জনগণের সচেতনতা। কুতুবদিয়ার সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে এটিকে একটি টেকসই উন্নয়নের মডেল হিসেবে গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত। “কুতুবদিয়া রক্ষায় একসঙ্গে কাজ করি, দ্বীপের সুরক্ষা নিশ্চিত করি।”

লেখক : নাজমুল হুদা সাকিব, শিক্ষার্থী,চট্টগ্রাম কলেজ।

আরও পড়ুন :
ভয়াবহ ২৯শে এপ্রিল দ্বীপের কান্না

মিডিয়া সন্ত্রাস ও প্রোপাগান্ডা: বিএনপির করণীয়

কুতুবদিয়ায় পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু : প্রয়োজন সতর্কতা ও সচেতনতা

আরও পড়ুন