ফরিদপুরে এক পরিবারের হাতে জিম্মি আদালত পাড়া, ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত সাধারণ মানুষ

ফরিদপুর জেলা বিচার বিভাগে কর্মরত একই পরিবারের পাঁচজন কর্মচারীর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, আদালতের নথি জালিয়াতি, মামলার রায় পরিবর্তন এবং বিচারপ্রার্থীদের ব্ল্যাকমেইল করার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

অভিযুক্তরা জেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আদালতে ডিস্ট্রিক্ট নাজির ও পেশকার (বেঞ্চ সহকারী) হিসেবে কর্মরত থেকে পুরো বিচারিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে জিম্মি করে রেখেছেন বলে জানা গেছে।

​এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণসহ আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। ফরিদপুরের একজন স্থায়ী বাসিন্দা ও সচেতন নাগরিকের পক্ষে এই আবেদন দুটি জমা দেওয়া হয়।

​অভিযোগের বিবরণ অনুযায়ী, এই কথিত সিন্ডিকেটের মূল হোতা ফরিদপুর জেলা আদালতের ডিস্ট্রিক্ট নাজির এ কে এম রফিক উদ্দিন। তাঁরই প্রত্যক্ষ প্রভাবে চাকুরির বিধিমালা লঙ্ঘন করে একই জেলায় তাঁর পরিবারের আরও চার সদস্যকে বিভিন্ন আদালতের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হয়েছে।

অভিযুক্তরা হলেন— নাজির রফিক উদ্দিনের আপন ভাই রাকিবুল ইসলাম (পেশকার, ভাঙ্গা সিনিয়র সহকারী জজ আদালত), তাঁর ছেলে (পেশকার, চরভদ্রাসন কোর্ট), তাঁর মেয়ে জামাই (পেশকার, সদরপুর কোর্ট) এবং তাঁর ভাগ্নি জামাই (পেশকার, ফরিদপুর আইন ও সহায়তা কেন্দ্র)।

​অভিযোগে বলা হয়, একই জেলায় ও একই বিভাগে এই পরিবারটির একচ্ছত্র প্রভাব থাকার কারণে সাধারণ বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীরা তাঁদের কাছে কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েছেন, যা সরকারি চাকুরির শৃঙ্খলা বিধিমালার স্পষ্ট লঙ্ঘন।

​আবেদনে এই চক্রের বিরুদ্ধে মূল্যবান সরকারি সম্পত্তি জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যক্তিমালিকানায় পাইয়ে দেওয়ার একটি ভয়ংকর তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। ভাঙ্গা সিনিয়র সহকারী জজ আদালতের একটি মামলার (নম্বর: ৬৩/০২) উদাহরণ টেনে অভিযোগে বলা হয়, ভাঙ্গা থানা সংলগ্ন ‘চৌবাচ্চা’ নামের একটি মূল্যবান জায়গা, যা সরকারের ১নং খাস খতিয়ানভুক্ত এবং জেলা প্রশাসকের নিয়ন্ত্রণাধীন। অভিযোগ রয়েছে, উক্ত আদালতের পেশকার রাকিবুল ইসলাম বাদীপক্ষের কাছ থেকে প্রায় অর্ধ কোটি (৫০ লাখ) টাকার সুবিধা নিয়ে সম্পূর্ণ ভুয়া ও ভিত্তিহীন নথিপত্র তৈরি করেন এবং সরকারের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে বাদীপক্ষের অনুকূলে রায় দেওয়ানোর ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করেন।

​অনুরূপভাবে, ফরিদপুর বিশেষ জেলা জজ আদালতের দেওয়ানি আপিল (নম্বর: ১৪৮/২০২২, রায় ঘোষণার তারিখ: ১৬/০৩/২০২৩) মামলাতেও একই ধরনের জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে রায় পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে এই চক্রের বিরুদ্ধে।

​অভিযোগপত্রে এই চক্রের অর্থলিপ্সার বিবরণ দিতে গিয়ে বলা হয়, আদালতের মূল নথি সরিয়ে ফেলা, শুনানির তারিখ গোপনে পরিবর্তন করা এবং মামলার নকল (কপি) সরবরাহের নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়া এই সিন্ডিকেটের নিত্যদিনের কাজ। কোনো বিচারপ্রার্থী বা ভুক্তভোগী তাঁদের দাবি মোতাবেক টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে, মামলার রায় বা আদেশে কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিসহ বিভিন্নভাবে তাঁদের ব্ল্যাকমেইল ও হয়রানি করা হয়।

​আবেদনকারী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন, এই পরিবারটির অনৈতিক কর্মকাণ্ডের ফলে ফরিদপুর জেলা বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার বিঘ্নিত হচ্ছে। বিচার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে ডিস্ট্রিক্ট নাজির কে এম রফিকুল ইসলামসহ এই সিন্ডিকেটের পাঁচ কর্মচারীর বিরুদ্ধে আনীত দুর্নীতি ও জালিয়াতির অভিযোগসমূহ জরুরি ভিত্তিতে তদন্ত করে কঠোর বিভাগীয় ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ফরিদপুর জেলা আদালতের ডিস্ট্রিক্ট নাজির এ কে এম রফিক উদ্দিন বলেন, আমি জেলা জজ অনুমতি ছাড়া এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে পারবো না। এরপর ব্যস্ত আছি বলে তিনি ফোনের লাইন কেটে দেন।