সিআই ইয়াসিনের সিন্ডিকেটে জিম্মি আরএনবি’র গোয়েন্দা শাখা

বাংলাদেশ রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) গোয়েন্দা (আইবি) শাখার মূল দায়িত্ব পর্দার আড়ালে থেকে রেলের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, গোপন তথ্য সংগ্রহ, চুরি প্রতিরোধ, অভ্যন্তরীণ অনিয়ম মনিটরিং এবং অপরাধ প্রতিরোধে সহায়তা করা। সিভিল পোশাকে গোপনে দায়িত্ব পালন করার নিয়ম হলেও রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের এই শাখাটি নিজেই এখন দুর্নীতি ও অনিয়মের আখড়ায় পরিণত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। যার নিয়ন্ত্রণকারী হিসেবে উঠে এসছে গোয়েন্দা শাখার দায়িত্বে থাকা চিফ ইন্সপেক্টর মো. ইয়াসিন উল্লাহ’র নাম।

অভিযোগ রয়েছে, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল আরএনবি গোয়েন্দা শাখার সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে কাজ না করে বেতন তোলা, ভুয়া ভ্রমণ ভাতা (টিএ) বিল তৈরি, চুক্তিভিত্তিক ডিউটি না করা, লাইন ডিউটির নামে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, টিএ বিল থেকে কমিশন গ্রহণ এবং সরকারি ডিউটির বিপরীতে পদস্থ কর্মকর্তাদের বাসায় ব্যক্তিগত কাজ করার মতো চরম রেল প্রশাসনিক শৃঙ্খলাভঙ্গের সাথে জড়িয়ে পড়েছেন।

তথ্য অনুযায়ী, ​গোয়েন্দা শাখায় সাদা পোশাকে দায়িত্ব পালনের সুযোগ নিয়ে চিফ কমান্ড্যান্টদের বাসায় ব্যক্তিগত কাজ করানোর ইতিহাস বহু পুরনো। গোয়েন্দা সদস্য কামরুজ্জামান বর্তমানে সিআই ইয়াসিনের বাসায় কাজ করছেন, এর আগে তিনি চিফ কমান্ড্যান্টের ব্যক্তিগত কাজে টানা এক বছর নিয়োজিত ছিলেন। কর্মকর্তাদের ব্যাক্তিগত কাজ করেও সরকারি বেতনের পাশাপাশি তিনি প্রতি মাসে ২৫ থেকে ২৮ দিনের ভুয়া টি/এ বিল ভাগিয়ে নিচ্ছেন। যা সরাসরি একটি অবৈধ কার্যক্রম।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আরএনবি সদস্য বলেন, সাদা পোশাকে কাজ করার আদলে চিফ স্যারদের বাসায় কাজ করার ইতিহাস বহু আগে থেকেই। যারা কাজ না করে মাসে মাসে ভুয়া টিএ বিল বানিয়ে ভোগ করে, তাদের প্রত্যেকের ব্যাংক একাউন্ট তদন্ত করলে খুব সহজেই এই দুর্নীতি বের করা সম্ভব হবে। এছাড়া সিআরবির একাউন্টস শাখার আরএনবির বিলের দায়িত্বে থাকা জুনিয়র অডিটর শাহিন আলম আলাদা কমিশনের মাধ্যমে এই বিল পাস করেন ।

​অভিযোগের এক পর্যায়ে উঠে আসে, সিপাহী জাকির হোসেন ও সিপাহী লুৎফুর রহমান দীর্ঘ ১৯ থেকে ২০ বছর যাবত গোয়েন্দা অফিসে ডিউটি করার কারণে তারা দপ্তরেই অবস্থান করেন। কিন্তু এই দুজনকে এস্কর্ট ডিউটি দেখানো হয় এবং তারা উভয়ে অফিস ডিউটি করলেও প্রতি মাসে লাইন ডিউটি দেখিয়ে ভুয়া টিএ বিল তৈরি করে নেন নিজেদের নামে। আইবিতে মোট স্টাফ আছেন প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ জন। এদের সবার নামে প্রতি মাসে আনুমানিক ৯ লাখ টাকার টিএ বিল হয়, যার মধ্যে সিটি টিএ ৫২০ টাকা আর নরমাল ভ্রমণ ভাতা ৪০০ টাকা করে পাওয়া যায়। জানা যায়, আইবি’তে কর্মরত আরএনবি সদস্যদের অর্জিত টিএ/ডিএ বিল থেকে শতকরা ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ সিআই এবং পোস্টিং হাবিলদারকে দিতে হয়। যার ১০ শতাংশ চিফ কমান্ড্যান্ট জহিরুল ইসলাম ও ১০ শতাংশ সদর কমান্ড্যান্ট ওমর ফারুখের অনুপস্থিতিতে বর্তমানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কমান্ড্যান্ট মোরশেদ আলম এবং বাকি অংশ সিআই ও পোস্টিং হাবিলদার এর নামে ভাগাভাগি হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

​এছাড়া সিপাহী মাসুদ আলম, সিপাহী ইকবাল হোসেন ও সিপাহী পার্থ কুমার ভৌমিক মাস চুক্তিতে ‘ভগবান’ থাকেন, অর্থাৎ অফিসে অনুপস্থিত থেকেও অফিসে হাজিরা বহাল থাকে। এর মধ্যে সিপাহী পার্থ কুমার ভৌমিক কাগজে-কলমে বিগত ১০ থেকে ১২ বছর আইবিতে কর্মরত থাকলেও কখনো অফিসে উপস্থিত ছিলেন না বলে অভিযোগ উঠেছে।

​জানা যায়, সিপাহী মাসুদ রানা, সিপাহী সাইফুল ইসলাম, সিপাহী কাজি মাইনুদ্দিন ও সিপাহী শাহিন মিয়া পাহাড়তলীতে লাইন ডিউটি করেন। সিজিপিওয়াই থেকে পাহাড়তলী লোকো সেডে ট্যাংক ওয়াগন করে তেল আনা-নেওয়ার দায়িত্ব থাকলেও এই লাইনে যারা কাজ করেন তাদের অনেককেই সরজমিনে ডিউটি করতে হয় না। পিডিবি লাইনের সিপাহীরা তাদের লাইনের গাড়িগুলো এস্কর্ট করে নিয়ে আসেন বলেই তাদের আর ডিউটি করা লাগে না। দোহাজারী শাটলের সাথে নিয়ে আসে সিআই পোস্টিংয়ের ভয়ে। এ ম্যানেজ প্রক্রিয়ায় সিআই এবং পোস্টিং হাবিলদারকে প্রতি মাসে ৭-৮ হাজার টাকা দেওয়া লাগে। পাহাড়তলী লাইনে মাসে সর্বোচ্চ দুই থেকে তিন দিন ডিউটি করলেও তারা তাদের নামে মাসে ২৭-২৮ দিন টিএ/ডিএ বিল তৈরি করে সরকারি টাকা আত্মসাৎ করে যাচ্ছে দিনের পর দিন।

সরোজমিনে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, পাহাড়তলী লাইনে আইবি’র সদস্যরা ডিউটিরত অবস্থায় নিয়মিত উপস্থিত থাকে না এবং আশেপাশের সিভিল স্টাফদের জিজ্ঞাসা করলে তারা তাদের সেখানে দেখেননি বলেও জানান।

​একইভাবে ঢাকার ডিএ সিটি (পদ্ম মেঘনা যমুনা লোডকৃত) ওয়াগন এস্কর্ট ডিউটিতে ১ জন হাবিলদার ও ৩ জন সিপাহীর দায়িত্ব থাকে। এই ডিউটি করার জন্য সিআই ও পোস্টিং হাবিলদারকে সিপাহীরা গড়ে সাড়ে ৪ থেকে ৫ হাজার এবং হাবিলদাররা ২ থেকে আড়াই হাজার টাকা করে দিতে বাধ্য হন। সিলেট, শ্রীমঙ্গল ও মংলা বাজারের ট্যাংক ওয়াগন এস্কর্ট ডিউটিতে ৩-৪ জন সিপাহী ডিউটি করে থাকেন। তারা একেকজন ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা করে সিআই/পোস্টিং হাবিলদার বাবদ উৎকোচ দিয়ে থাকেন। রংপুর লাইনে এস্কর্ট ডিউটিতে ১ জন হাবিলদার ও ৩ জন সিপাহীর দায়িত্ব থাকে, এরাও জনপ্রতি ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা করে মাসিক মাসোহারা দেয়।

​পাহাড়তলী লাইনে যাদের এস্কর্ট থাকে তাদের কাজ হলো সিজিপিওয়াই থেকে সরকারি তেল আনা-নেওয়ার এস্কর্ট ডিউটি করা, কিন্তু তারা সবসময় উপস্থিত থাকেন না। এতে হাটহাজারী ও দোহাজারীতে যারা কাজ করে তারাই নিয়ে আসেন পাহাড়তলীতে, যা বিভিন্ন গার্ডদের সূত্রেও নিশ্চিত হওয়া গেছে। এই সুবিধার বিনিময়ে সিআই ও পোস্টিং হাবিলদারকে মাসে ৭ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত মাসোহারা দেওয়া লাগে, যা আবার ৬০% থেকে ৪০% হারে ভাগাভাগি হয় সিআই ও পোস্টিং হাবিলদারের মধ্যে।

​তথ্য সূত্রে জানা যায়, সিআই ইয়াসিন উল্লাহ শ্রমিক লীগ নেতা রহমত উল্লাহ চৌধুরীর ছেলে ভাস্কর চৌধুরীর তদবীরে ২০০৪ সালের নিয়োগে এএসআই পদে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। আরএনবির গোয়েন্দা শাখায় আসার আগে তিনি সিজিপিওয়াইতে সিআই পদে কর্মরত ছিলেন। তৎকালীন সময়ে দায়িত্বে থাকাকালীন রেলের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ পাচার করে বিভাগীয় মামলায় অভিযুক্ত হয়েছিলেন বলে জানা যায়। এছাড়াও লোকোসেডের তেল চুরিতেও তিনি অভিযুক্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়, যা নিয়ে আগেও বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এর আগে সিজিপিওয়াই থাকাকালীন গত ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসের ২৪ তারিখে ট্রানজিট ইয়ার্ড এলাকা থেকে রেলওয়ের ব্যবহৃত কাঠের স্লিপার পাচারকালে স্থানীয় জনতার তোপের মুখে পড়ে ওইসব ট্রাক ভর্তি মালামাল সিজিপিওয়াই এর চৌকিতে নিয়ে আসা হয়। এতে তখন কোনো মামলা করা হয়নি; বরং আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে সেই ট্রাক ও ট্রাক ভর্তি স্লিপার ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

​এদিকে সোহেল আহম্মদ, যিনি আইবিতে ১০ থেকে ১১ বছর কর্মরত আছেন, এবং মো. ইব্রাহিম ও সাইফুল ইসলামসহ কেউ কেউ প্রতিদিন ৩০০ টাকা করে প্রতি মাসে গড়ে ১০ থেকে ১৫ দিন মাসিক চুক্তিতে থাকার তথ্য পাওয়া যায়—যাকে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর ভাষায় ‘ভগবান ডিউটি’ বলে। আবার এদের নামেও ভুয়া টিএ বিল করা হয় এবং তথ্য ফাঁস হলে তাদের নামে অগ্রিম ছুটি দেখিয়ে দেওয়া হয়। এছাড়াও জানা যায়, তেলচোর ধরার জন্য ফাঁদ পাতা ডিউটির নামে শর্শদী, মাস্তান নগর ও ফৌজদারহাট এলাকায় ডিউটি বণ্টন করা হলেও কোনো সদস্যের সেখানে উপস্থিত হওয়া লাগে না। এখানে যাদের নামে ডিউটি বণ্টন করা হয়, তাদের নামেও ভুয়া টিএ/ডিএ বিল তৈরি করা হয়। অনুসন্ধানে সেখানকার স্টেশন মাস্টার, পয়েন্টসম্যান ও পোর্টারদের সূত্রে জানা যায়, এখানে গোয়েন্দা শাখার লোক আসেই না।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানতে বাংলাদেশ রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) গোয়েন্দা (আইবি) শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা চিফ ইন্সপেক্টর (সিআই) ইয়াসিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, তিনি প্রায় দেড় বছর ধরে গোয়েন্দা শাখার দায়িত্বে রয়েছেন। ভুয়া টি/এ বিল উত্তোলনের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, ডিউটি না করলে টি/এ বিল করার কোনো সুযোগ নেই। যারা বাহিরে দায়িত্ব পালন করেন, তারাই কেবল টি/এ বিল উত্তোলন করেন। সরকারি জনবলকে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, বাহিনীতে এমন কোনো সুযোগ নেই। তবে প্রতিবেদনে উত্থাপিত অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে তিনি কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা না দিয়ে সেগুলো এড়িয়ে যান এবং অভিযোগগুলোকে মিথ্যা বলে দাবি করেন।

এ বিষয়ে জানতে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা বাহিনীর প্রধান চিফ কমান্ড্যান্ট (সিসি আরএনবি) জহিরুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।

আরও পড়ুন