বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গত পনেরো বছর ধরে এক ভয়াবহ দুঃসময় অতিক্রম করেছে। এই সময়ে রাজপথে একের পর এক গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনে হাজারো নেতাকর্মী হামলা-মামলার শিকার হয়েছেন, কারাভোগ করেছেন, রক্ত দিয়েছেন, প্রাণ দিয়েছেন। তবুও তারা দল ও নেত্রীর প্রতি অটল থেকেছেন। কিন্তু ইদানীং একইসাথে আমাদের চোখে পড়েছে সুবিধাবাদীদের ভিন্ন এক চিত্র। গত দুঃসময়ে অসংখ্য সামাজিক অনুষ্ঠানে আমরা দেখেছি, বিএনপির কোনো সিনিয়র নেতা উপস্থিত হলে অনেকে দূরে সরে যেতেন। বিশেষ করে শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা। তারা আতঙ্কিত থাকতেন। হয়তো সরকারের চোখে পড়লে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য বা পদ-পদবী ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই নেতার পাশে বসা তো দূরের কথা, প্রয়োজনে অনুষ্ঠান থেকে তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে যেতেন। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় যখন বিএনপির জনপ্রিয়তা আবার নতুন উচ্চতায়, তখন সেই একই মুখগুলো হঠাৎ করেই গিরগিটির মত রঙ বদলিয়ে ফেলেছে। এখন তারা সিনিয়র নেতাদের পাশে বসতে মরিয়া, দাওয়াত দিতে ব্যস্ত, সেলফির জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। এটাই সুবিধাবাদীদের প্রকৃত চেহারা। তাদের কোনো নীতি নেই, শুধু সুযোগ বুঝে রঙ বদলায়। এদের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর চরিত্র হলো তথাকথিত “বিএনপি-ঘেঁষা” ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা। যখন দল রক্ত দিচ্ছিল, রাজপথে সংগ্রামে লিপ্ত ছিল, তখন তারা আওয়ামী লীগের নেতাদের সাথে সখ্যতা বজায় রেখে আরামে ব্যবসা করেছেন, সম্পদ বাড়িয়েছেন। তারা কখনোই রাজপথের সংগ্রামের পাশে ছিলেন না, বরং নিরাপদ দূরত্বে থেকে শুধু নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করেছেন। অথচ আজ তারা আবার দলে ঘনিষ্ঠ হওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত।
এখানে একটি দুঃখজনক বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই – শুধু সুবিধাবাদীরা নয়, আমাদের অনেক পুরনো ও সিনিয়র নেতারাও দুঃসময়ে রাজপথে ছিলেন না। তারা নিরাপদ দূরত্বে থেকেছেন, আন্দোলনে সরাসরি অংশ নেননি। তারা হয়তো ভেবেছিলেন, রাজপথে নামলে নিজের মর্যাদা বা অবস্থান ক্ষুণ্ণ হবে। একজন বয়োজ্যেষ্ঠ ও শারীরিক অসুস্থ দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘ কারাবাসে কষ্ট সহ্য করেছেন। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান বিদেশে থেকেও হামলা-মামলার বোঝা বয়ে নিয়ে দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। হাইকমান্ড থেকে তৃণমূলের লাখো নেতাকর্মী জেল-জুলুমের জীবন কাটিয়েছেন।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান স্পষ্ট করে দিয়েছেন – দুঃসময়ের আন্দোলনে জীবন বাজি রেখে যারা সংগ্রামে অংশ নিয়েছেন, তারাই দলের প্রকৃত সম্পদ। তাদেরকে অবশ্যই মূল্যায়ন করা হবে। আর যারা হাইব্রিড বা সুবিধাবাদী, তাদের কোনোভাবেই দলের পদ-পদবীতে জায়গা হবে না। তিনি প্রতিটি সভা সেমিনারে স্পষ্টভাবে বলেছেন – বিএনপির নাম ভাঙিয়ে কোনো অপকর্ম করা যাবে না। দলের স্বার্থে যারা অন্যায় করে, তাদের বিরুদ্ধে থাকবে জিরো টলারেন্স। তার প্রমাণও তিনি রাখছেন। এই পর্যন্ত দলের সাংগঠনিক পরিপন্থী কর্মকাণ্ডের কারণে বিএনপি কয়েক হাজার নেতাকর্মীকে বহিস্কার করেছেন এবং অনেককে কঠোর বার্তাও দিয়েছেন। একইসাথে তিনি বিএনপির জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হওয়া দেশী-বিদেশী গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র, মিডিয়া ট্রায়াল, অপপ্রচার কিংবা বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী ও দেশ-বিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকার জন্য নেতাকর্মীদেরকে সোচ্চার থাকার জন্য নির্দেশ অব্যাহত রেখেছেন। জনাব তারেক রহমান পরিষ্কার বলেছেন – বিএনপি কখনো জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়নি, হবেও না। দেশের সার্বিক উন্নয়নে জনগণের পাশে থেকে কাজ করা বিএনপির মূল অঙ্গীকার। জনগণের মৌলিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামে বিএনপি সর্বদা সোচ্চার ছিল এবং থাকবে। কোনো অন্যায়কারী, দুর্নীতিবাজ কিংবা সুবিধাবাদীকে বিএনপির নাম ব্যবহার করে লাভবান হতে দেয়া হবে না। কারণ বিএনপি শুধু একটি রাজনৈতিক সংগঠন নয়, এটি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শে গড়া একটি জনগণের কাফেলা।
আজ তাই দুঃসময়ের মজলুমদের প্রশ্ন একটাই – এই দল কার? যারা দুঃসময়ে ত্যাগ করেছেন, রাজপথে থেকেছেন, গুলি-গ্রেফতার মোকাবিলা করেছেন, নাকি তারা যারা সুযোগ পেলেই রঙ বদলেছে, নিরাপদ দূরত্বে থেকে শুধু ব্যবসা ও স্বার্থ রক্ষা করেছে? বিএনপি একটি ত্যাগী, গণতান্ত্রিক, জনগণের দল। তাই অবশ্যই ত্যাগীদের মর্যাদা দিতে হবে, সুবিধাবাদীদের বঞ্চিত করতে হবে। অন্যথায় আন্দোলনের আসল সৈনিকদের মধ্যে হতাশা তৈরি হবে, আর দল আবারো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর কবলে পড়বে। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রাম একদিনে আসেনি, আসবেও না। এর জন্য প্রয়োজন ত্যাগ, দৃঢ়তা এবং নীতির প্রতি অনুগত থাকা। বিএনপি সেই ত্যাগী আদর্শের দল। শহীদ জিয়ার অমূল্য বাণী – “ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অঙ্গীকার – “এদেশ আমার, বাংলাদেশ ছেড়ে কোথাও যাবো না। মরতে হলে এদেশেই মরবো। কিন্তু অন্যায়ের সাথে আপোষ করবো না”। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমানের দৃঢ় ঘোষণা – “সবার আগে দেশ”। তাই বিএনপি জনগণের ভালোবাসার দল, বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ জনপ্রিয় রাজনৈতিক সংগঠন। এ সংগঠন সবসময়ই মজলুমের পাশে থেকেছে, থাকবে। অন্যায়কারী বা সুবিধাবাদীরা যতই চেষ্টা করুক, বিএনপিকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। কারণ, যারা দুঃসময়ে রাজপথে ছিল, তারাই আসল শক্তি, বাকিরা শুধু ভাড়াটে দর্শক।
লেখক:
মোঃ মঈনুল আলম ছোটন
আহ্বায়ক – শহীদ জিয়া স্মৃতি সংসদ,
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা।
সাবেক সদস্য (দপ্তরের দায়িত্ব প্রাপ্ত),
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপি।