নাজমুল হুদা সাকিব :: আকাশ অদ্ভুত নীল ছিল সেদিন সকালবেলা। কেউ বুঝতেই পারেনি, দ্বীপের নরম মাটির নিচে যেন কী এক অশনি সংকেত জমে উঠছে ২৯শে এপ্রিল, ১৯৯১ এ। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতেই, হঠাৎ আকাশ কালো হয়ে গেল।
সাগরের বুক ফুলে উঠল উত্তাল ঢেউয়ে। বাতাসের শব্দ যেন মৃত্যুর মন্ত্রপাঠ।
গাঙের ধারে ছোট্ট ঘরে মা তার দুই ছেলেকে কোলে নিয়ে বসে ছিল।
বাবা তখনও ঘরে ফেরেনি, নদীর ওপারে মাছ ধরতে গিয়েছিল।
মা জানত না, এ বিদায় অমোচনীয়।
হঠাৎ একটা প্রচণ্ড ঝটকা। ঘরের চাল উড়ে গেল দূরে।
কাদামাখা পানি ঢুকে পড়ল বুকসমান হয়ে।
মা চিৎকার করছিল, “আল্লাহ গো, বাঁচাও!”
কিন্তু প্রকৃতি আজ যেন কানে তুলছিল না কোনো প্রার্থনার শব্দ।
পাড়ার মসজিদের মিনার উপড়ে গেল। স্কুলঘর ভেঙে পড়ে শিশুরা চিরঘুমে ঢলে পড়ল।
গরু, ছাগল, নৌকা,কিছুই আর আপন রইল না।
সেই রাতে, দ্বীপের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিল শুধু কান্না আর মৃতদেহের স্তূপ।
কে কার আপন, কে কার পর — সেই হিসাব মিলানোর আর সময় ছিল না।
সকালের প্রথম আলোয় দেখা গেল, দ্বীপ যেন এক মৃত্যুপুরী।
মায়ের কোল খালি। দুই শিশুর ছোট ছোট নিথর দেহ বয়ে নিয়ে গেল স্রোত।
বাবা? সে তো ফিরলই না আর।
কত লাশে খালে বিলে পড়ে রয়েছে,একটি কবরে কতজনের নিথর দেহ দাফন করা হয়েছিলো সে সংখ্যার ইয়ত্তা নেই।
আজও ২৯শে এপ্রিল এলে, বাতাসে ভেসে আসে সেই কান্নার শব্দ।
ভেসে আসে ভাঙাচোরা বাঁশের ঘরের ছবি।
ভেসে আসে, মা হারানোর ব্যথায় ফেটে পড়া শিশুদের শূন্য দৃষ্টি।
২৯শে এপ্রিল —
দ্বীপের মাটিতে এখনও জমে আছে, হারানো জীবন আর না বলা শেষ কথার স্মৃতি।
আরও করুণ কথা হলো, এত বছর পেরিয়ে গেলেও —
আজও সেই দ্বীপাঞ্চল টেকসই বেড়িবাঁধের জন্য হাহাকার করছে।
আজও দুর্বল মাটির বাঁধ ভেঙে, একটু বড় ঝড়েই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে।
আজও ঠিক ২৯শে এপ্রিল এলে, মানুষের মনে ভেসে ওঠে সেই রাতের আর্তনাদ —
যখন প্রকৃতি সমস্ত ভালোবাসাকে এক ঝটকায় ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিল।
আর রাষ্ট্র? তারা রেখে গেছে শুধু কিছু প্রতিশ্রুতির ফাঁকা শব্দ —
টেকসই বেড়িবাঁধের স্বপ্নে আজও বেঁচে আছে দ্বীপের অসহায় মানুষগুলো।
লেখক : নাজমুল হুদা সাকিব, কুতুবদিয়ার একজন নাগরিক।