চট্টগ্রামের রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে ভূ-সম্পত্তি বরাদ্দের নামে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। তবে এবার সামনে এসেছে এক অভিনব অনিয়মের ঘটনা—এখতিয়ার না থাকা সত্ত্বেও রেলের জায়গা বরাদ্দ দিয়েছেন বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তা (ডিসিও) তৌষিয়া আহমেদ। আর সেই বরাদ্দের শর্ত ভেঙে রেলের জায়গায় গড়ে উঠেছে অবৈধ স্থায়ী দ্বিতল মার্কেটের আদলে বানিজ্যিক দোকানপাট।
রেলওয়ে ভূ-বরাদ্দ নীতিমালা ২০২০-এর ৩১ ধারা অনুযায়ী, কেবল স্টেশন প্ল্যাটফর্মের খোলা জায়গা এবং স্টেশন সীমানার (ইয়ার্ডের) ভেতরের আচ্ছাদিত অংশের লাইসেন্স দেওয়ার এখতিয়ার রয়েছে বাণিজ্যিক বিভাগের। স্টেশন ইয়ার্ডের বাইরের যেকোনো জায়গা বরাদ্দের জন্য ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা (ইস্টেট অফিসার)-র দপ্তর থেকে নির্দিষ্ট নীতি অনুসরণ ও টেন্ডার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিতে হয়।
কিন্তু কোন নিয়মের তোয়াক্কা না করেই ২০২৫ সালের ১৬ নভেম্বর বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তা (ডিসিও) তৌষিয়া আহমেদের স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে খান অ্যাসোসিয়েটকে পাহাড়তলী স্টেশন সীমানায় গোডাউন নির্মাণের জন্য ৩০০ বর্গফুট জায়গার বাণিজ্যিক লাইসেন্স দেওয়া হয়। লাইসেন্সের স্মারক নম্বর ৫৪.০১.১৫০০.২৫৪.২৮.২১৫.২৫।
কাগজপত্রে বরাদ্দের স্থান পাহাড়তলী স্টেশন সীমানার মধ্যে উল্লেখ করা হলেও সরেজমিনে দেখা যায়, জায়গাটি পাহাড়তলী স্টেশন পার হয়ে পাহাড়তলী বাজার অতিক্রম করে মাদ্রাসা রোড এলাকায় অবস্থিত। অর্থাৎ জায়গাটি শুধু স্টেশন ইয়ার্ডের বাইরেই নয়, পাহাড়তলী স্টেশন এলাকা থেকেও প্রায় আধা কিলোমিটার দূর। ফলে স্টেশন সীমানার উল্লেখ করে এ জায়গায় বাণিজ্যিক লাইসেন্স দেওয়ার এখতিয়ার নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।
এদিকে, লাইসেন্সের শর্ত অনুযায়ী নির্ধারিত জায়গায় গোডাউন নির্মাণ করে রেলপথে পরিবাহিত মালামাল সংরক্ষণের কথা থাকলেও সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে বিস্তৃত এলাকাজুড়ে স্থায়ী দোতলা দোকানপাট। গোডাউনের পরিবর্তে জায়গাটিকে ছোট একটি মার্কেটের আদলে গড়ে তুলে বিভিন্ন দোকান ভাড়া দেওয়া হয়েছে।
বরাদ্দপত্রের ৪ নম্বর শর্তে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে, ‘উক্ত জায়গায় গোডাউনের মালামাল রাখা, লোডিং ও আনলোডিং ব্যতীত অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা যাবে না।’ অথচ অভিযোগ, নির্ধারিত উদ্দেশ্যের বাইরে জায়গাটি ব্যবহার করে সেখানে দোকানপাট নির্মাণ ও ভাড়া দেওয়া হচ্ছে। এতে বরাদ্দের শর্তের যথাযথ পরিপালন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অন্যদিকে, বরাদ্দপত্রের ১০ নম্বর শর্তে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি ছাড়া উল্লিখিত স্থানে মাটি কাটা বা স্থানান্তর করা এবং বরাদ্দের অতিরিক্ত জায়গা দখল না করার নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু গোডাউন নির্মাণের জন্য বরাদ্দ নেওয়া জায়গায় অতিরিক্ত স্থাপনা নির্মাণ ও জায়গা দখল করে দোকান ভাড়া দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
বরাদ্দপত্রের ১৪ নম্বর শর্তে বলা হয়েছে, চুক্তিপত্রের কোনো শর্ত ভঙ্গ হলে লাইসেন্স তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল বলে গণ্য হবে। অথচ, বরাদ্দের শর্ত লঙ্ঘন করে গোডাউনের পরিবর্তে দোকানপাট নির্মাণ ও ভাড়া দেওয়ার অভিযোগ উঠলেও এ বিষয়ে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নিয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। শর্ত ভঙ্গের অভিযোগের পরও লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, নির্মিত দোকানগুলোর প্রতিটি থেকে অগ্রিম হিসেবে ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা এবং মাসিক ভাড়া বাবদ ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা আদায় করা হচ্ছে।
রেলওয়ের প্রচলিত ভূসম্পত্তি বরাদ্দপ্রক্রিয়া অনুযায়ী, স্টেশন ইয়ার্ডের বাইরে রেলওয়ের জমি বাণিজ্যিকভাবে বরাদ্দের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ভূসম্পত্তি দপ্তরের মাধ্যমে নির্ধারিত নিয়ম ও শর্ত অনুসরণ, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। সে ক্ষেত্রে পাহাড়তলী স্টেশন এলাকা থেকে দূরবর্তী একটি জায়গা কীভাবে বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তার দপ্তর থেকে লাইসেন্সের আওতায় আনা হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। জায়গাটির অবস্থান, বরাদ্দ প্রদানের এখতিয়ার, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সুপারিশ এবং অনুমোদনপ্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে খান অ্যাসোসিয়েটের স্বত্বাধিকারী মো. মতিউর রহমানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আপনি যেটা বলেছেন, শুনেছি। আপনার কিছু জানার থাকলে রেলওয়ে থেকে জেনে নিয়েন।” এ কথা বলেই তিনি মুঠোফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মামুনুল ইসলাম বলেন, “ইয়ার্ডের বাইরে হলে বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তার মাধ্যমে বরাদ্দ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সে ক্ষেত্রে রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তার দপ্তরের মাধ্যমে সব নিয়মকানুন অনুসরণ করে বরাদ্দ দিতে হবে। বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।”
অভিযোগের বিষয় জানতে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তা তৌষিয়া আহমেদের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদে বার্তা পাঠানোর চেষ্টা করলে দেখা যায়, তিনি প্রতিবেদকের নম্বরটি ব্লক করে রেখেছেন।