চট্টগ্রাম সিএমপির বন্দর থানার সাবেক ও বর্তমানে হালিশহর থানায় কর্মরত এসআই মো. ইয়াছিনের বিরুদ্ধে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে টাকা নেওয়া, মামলা দিয়ে হয়রানি ও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ উঠেছে।
বন্দর এলাকার ট্রান্সপোর্ট ব্যবসায়ী মো. নূর উদ্দিনের লিখিত অভিযোগে ১ লাখ ৮৩ হাজার টাকার মোবাইল, ৫০ হাজার টাকা ও ২১ হাজার টাকা নেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। পরে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা এবং মামলা মীমাংসার নামে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও করা হয়েছে। অভিযোগের সঙ্গে অর্থ লেনদেনের ভিডিও, কথোপকথনের অডিও ও বিভিন্ন নথি রয়েছে।
পুলিশ কমিশনার বরাবর ১৮ আগস্ট ২০২৬ দেওয়া লিখিত অভিযোগে নূর উদ্দিন জানান, বারিক বিল্ডিং এলাকার সাবের প্লাজার চতুর্থ তলায় তাঁর ট্রান্সপোর্ট ব্যবসার প্রতিষ্ঠান। ব্যবসার সূত্রে বন্দর থানায় কর্মরত ইয়াছিনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। পরে তাঁর অফিসে যাতায়াতের একপর্যায়ে নিজের মোবাইল নষ্ট হওয়ার কথা জানিয়ে নতুন ফোন কিনে দিতে বলেন ইয়াছিন। টাকা ফেরত দেওয়ার আশ্বাসে নূর উদ্দিন তাঁকে সঙ্গে নিয়ে ১ লাখ ৮৩ হাজার টাকা দিয়ে ফোনটি কিনে দেন। পরবর্তী সময়ে সেই টাকা ফেরত দেওয়া হয়নি।
এরপর অর্থ চাওয়ার ঘটনা বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে নূর উদ্দিনের গাড়িচালক বিপ্লবকে থানায় নেওয়া হয়। তাঁকে ছাড়াতে ১ লাখ টাকা চাওয়া এবং টাকা না দিলে চার-পাঁচটি মামলা দেওয়ার কথা বলা হয় বলে লিখিত অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। পরে ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। এরপরও বিপ্লবকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৮৮ ধারায় আদালতে পাঠানো হয়। নূর উদ্দিনের অভিযোগ, বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে পরে তাঁকেও ফোন করে টাকা চাওয়া হতো।
এই ধারাবাহিকতায় ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ আরও ২১ হাজার টাকা দেওয়ার কথা লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেন নূর উদ্দিন। ওই লেনদেনের ভিডিও তাঁর কাছে রয়েছে বলেও তিনি পুলিশ কমিশনারকে জানান। একই অভিযোগে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কার্যালয়ে গেলে তাঁকে ‘ক্রসফায়ারে’ দেওয়া হতে পারে এমন হুমকির কথাও উল্লেখ করা হয়। পরে বিষয়টি নিয়ে পুলিশ কমিশনার ও জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন তিনি।
এরপরই তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার ঘটনা সামনে আসে। নূর উদ্দিনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বন্দর থানার মামলা নম্বর-১৪, ১১ মে ২০২৬-এর মামলায় তাঁকে ও তাঁর গাড়িচালককে আসামি করা হয়। মামলায় বিভিন্ন অবৈধ মালামাল জব্দের তথ্য রয়েছে। তবে এসব মালামালের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে জানান নূর উদ্দিন। সম্ভাব্য হয়রানির আশঙ্কায় এর আগেই পুলিশকে অভিযোগ ও জিডি করার পরও তাঁকে মামলায় জড়ানো হয়েছে বলে তাঁর অভিযোগ।
মামলার বাদী মোহাম্মদ জামাল হোসেনকে ইয়াছিনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে উল্লেখ করেছেন নূর উদ্দিন। তাঁর অভিযোগ, জামালকে ব্যবসায়ী পরিচয়ে ব্যবহার করে মামলায় তাঁকে ফাঁসানো হয়েছে। জামাল হোসেনের আগের মামলার তথ্যও সরবরাহ করা পুলিশ-সংক্রান্ত নথিতে পাওয়া গেছে। এতে দেখা যায়, বন্দর থানার এফআইআর নম্বর-১২, ১৮ মার্চ ২০২৪-এর মামলায় দণ্ডবিধির ৪০৭ ও ১০৯ ধারায় তাঁকে আসামি করা হয়। ২৭ মার্চ ২০২৪ তাঁকে গ্রেপ্তারের তথ্য রয়েছে। পরে ৩০ জুন ২০২৫-এর চার্জশিটে তাঁকে অভিযুক্ত করা হয়।
একই নথিতে বিদেশে রপ্তানির জন্য পাঠানো গার্মেন্টস পণ্য কাভার্ডভ্যান থেকে আত্মসাৎ করে বাইরে বিক্রির অভিযোগে বন্দর থানা পুলিশের হাতে পাঁচজন গ্রেপ্তারের তথ্য রয়েছে। তাঁদের মধ্যে জামাল হোসেনের নামও রয়েছে।
অর্থ লেনদেনের অভিযোগের প্রতিবেদকের হাতে আসা ৪৯ সেকেন্ডের একটি অডিওও সামনে এসেছে। এতে ইয়াছিনের কণ্ঠে ‘ভাইয়েরে দিতে হয়বো তো। সেদিনই তো কইলাম ভাইয়ের দরকার বেশি’—এমন কথা শোনা যায়। জবাবে নূর উদ্দিনকে ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, বলছি তো’ বলতে শোনা যায়। কথোপকথনের পরের অংশে ৫০ হাজার টাকা দেওয়ার প্রসঙ্গ আসে। একই অডিওতে ‘ভাই, ওয়াদা করছি, কাজ করে দেওয়া’ এমন কথাও রয়েছে বলে নূর উদ্দিন জানিয়েছেন।
এ ছাড়া প্রতিবেদকের হাতে আসা আরেকটি ভিডিওতে টাকা লেনদেনের দৃশ্য রয়েছে। ভিডিওতে তাঁকে ইয়াছিনের হাতে টাকা দিতে দেখা যায়। আরেকটি কথোপকথনে টাকা নেওয়া এবং একটি কাজ করে দেওয়ার প্রসঙ্গ রয়েছে।
মামলার পর সেটি মীমাংসার ক্ষেত্রেও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ সামনে এসেছে। নূর উদ্দিনের অভিযোগ, মামলা তুলে নেওয়ার জন্য তাঁর কাছ থেকে কয়েক লাখ টাকা নেওয়া হয়। পরে জামাল হোসেনের সঙ্গে তাঁর কথোপকথনের একটি অডিওতে জামালকে ২ লাখ টাকা পাওয়ার কথা বলতে শোনা যায়। একই কথোপকথনে ইয়াছিনের বিরুদ্ধে করা অভিযোগ প্রত্যাহারের বিষয়েও কথা হয় বলে নূর উদ্দিন জানান।
নূর উদ্দিন বলেন, ‘মামলা তুলে নেওয়ার জন্য আমার কাছ থেকে কয়েক লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। পরে বাদী নিজেই বলেছে, সে ২ লাখ টাকা পেয়েছে। আমাকে বলা হয়েছে, আগে ইয়াছিনের বিরুদ্ধে করা অভিযোগ তুলে নিতে হবে। এসব কথার রেকর্ড আমার কাছে আছে।’
নূর উদ্দিনের দেওয়া কাগজপত্রের মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আয়কর বিভাগের ২০২৫–২০২৬ কর নির্ধারণী বছরের আয়কর সনদও রয়েছে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ট্রান্সপোর্ট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তাঁর বিরুদ্ধে করা মামলাকে মিথ্যা উল্লেখ করে নূর উদ্দিন বলেন, এতে তাঁর ব্যবসায়িক সুনাম ও পারিবারিক মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে এসআই মো. ইয়াছিন বলেন, ‘ওই ব্যক্তিকে আগে চিনতাম না। বন্দর থানা সূত্রে তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। পরে কোনো এক সূত্রে তাঁর সঙ্গে আমার জানাশোনা হয়। সে গাড়ি ভাড়া দিত, আমার ভাইয়ের গাড়ি ছিল। বিভিন্ন সময়ে সে গাড়ি ভাড়া নিত এবং ভাড়া বাবদ টাকা পরিশোধ করত। পরে গাড়ি ভাড়ার কিছু টাকা বাকি বা আটকে থাকায় সেই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়।হয়তো টাকা দেওয়ার সময় সে ভিডিও করে রেখেছে। আপনারা যাচাই-বাছাই করেন।’
এদিকে মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) দামপাড়ায় সিএমপির ‘ওপেন হাউজ ডে’তে পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী বলেন, ‘নগরবাসীর অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত সমাধান করতে হবে। পুলিশের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সেবাপ্রত্যাশীদের কোনো ধরনের হয়রানি বরদাশত করা হবে না। জনগণের আস্থা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সদস্যদের আন্তরিকতা, দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহির সঙ্গে কাজ করতে হবে।’