ব্রিজ নির্মাণ হয়েছে, কিন্তু ব্রিজে ওঠার রাস্তা নেই। সংযোগ সড়কের দুই পাশে মাটি ভরাট না করায় কয়েক লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ব্রিজটি এখন স্থানীয়দের কোনো কাজে আসছে না। সড়কের বড় বড় গর্ত ও খানাখন্দের কারণে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে স্বাভাবিক চলাচল।
চট্টগ্রামের হাটহাজারী পৌরসভার সুজানগর-চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) সংযোগ সড়কের এমন চিত্রে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন শিক্ষার্থী, কৃষক ও চাকরিজীবীরা। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় চার মাস ধরে সড়কটির বেহাল অবস্থার কারণে অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত স্কুল-মাদ্রাসায় যেতে পারছে না।
সুজানগর, খেরু পাড়া, মৌলভি পাড়া ও মিয়াজি পাড়াসহ আশপাশের কয়েকটি এলাকার কয়েকশ মানুষ প্রতিদিন এই সড়ক ব্যবহার করেন। স্থানীয়দের হিসাবে, প্রতিদিন প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ মানুষ এ পথে যাতায়াত করেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মানুষের চলাচল সহজ ও নিরাপদ করার উদ্দেশ্যে ব্রিজ নির্মাণ করা হলেও কাজ শেষ হওয়ার পর ব্রিজের দুই পাশের সড়ক মেরামত বা প্রয়োজনীয় মাটি ভরাট করা হয়নি। ফলে ব্রিজ থাকলেও এর সঙ্গে সংযোগ তৈরি হয়নি স্বাভাবিক সড়ক যোগাযোগের।
জানা গেছে, সৈয়দ ওয়াহিদুল আলম সড়কের সুজানগর-চবি সংযোগ সড়কের ওপর ব্রিজটির নির্মাণকাজ চলতি বছরের জুন মাসে শেষ হয়। ২০২৫ সালে কাজটি পায় এন ইসলাম নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। চলতি বছরের শুরুতে নির্মাণকাজ শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি।
কিন্তু ব্রিজের কাজ শেষ হওয়ার পর সংযোগ সড়কের বেহাল অংশগুলো আগের অবস্থাতেই পড়ে থাকে। কোথাও বড় গর্ত, কোথাও নিচু হয়ে যাওয়া সড়ক, সব মিলিয়ে যানবাহন তো দূরের কথা, পথচারীদের চলাচলও কঠিন হয়ে পড়েছে।
এ অবস্থায় চবি এলাকার উষ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হামিউল উম্মাহ মহিলা মাদ্রাসা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। স্থানীয় অভিভাবকদের আশঙ্কা, দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে না পারায় অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ছে।
সুজানগরের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইমন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে এখন অনেক ঘুরে যেতে হয়। এতে সময় ও অতিরিক্ত গাড়িভাড়া দুই-ই বাড়ছে। দ্রুত সড়কটি চলাচলের উপযোগী করা দরকার।
উষ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির এক শিক্ষার্থী জানায়, সড়কের সমস্যার কারণে অনেকদিন ধরে সে নিয়মিত স্কুলে যেতে পারছে না।
স্থানীয় কৃষক নুর আলম বলেন, উৎপাদিত সবজি নিয়ে তিনি নিয়মিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার বাজারে যেতেন। কিন্তু সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে এখন সেখানে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। দ্রুত সড়কের দুই পাশে মাটি ভরাট করে চলাচলের ব্যবস্থা করার দাবি জানান তিনি।
তবে ঠিকাদার তাজুল ইসলাম টিপুর দাবি, ব্রিজ নির্মাণের অনুমোদিত কাজের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মাটি ভরাটের কাজ ছিল না।
তিনি বলেন, কাজের এস্টিমেটে যতটুকু বরাদ্দ থাকে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ততটুকুই করতে পারে। মাটি ভরাটের প্রয়োজনীয়তা যদি এস্টিমেটে না থাকে, তাহলে ঠিকাদারের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত কাজ করা সম্ভব নয়।
এদিকে প্রকল্পের পরিকল্পনা ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ, ব্রিজ নির্মাণের আগে সংযোগ সড়কের বাস্তব পরিস্থিতি যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হলে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ওই কাজের সময় মাঠপর্যায়ে দায়িত্বে ছিলেন তৎকালীন উপসহকারী প্রকৌশলী ফয়সেল আহমেদ খান। স্থানীয়দের অভিযোগ, ব্রিজের দুই পাশে সড়কের মাটি ভরাটের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি। পাশাপাশি প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদনের ক্ষেত্রেও যথেষ্ট যাচাই-বাছাই হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে ফয়সেল আহমেদ খানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বর্তমানে তিনি ভৈরব পৌরসভায় কর্মরত। মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
হাটহাজারী পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী জেড. এম. আনোয়ারের বক্তব্যের জন্য তার কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলে জানা যায়, তিনি দাপ্তরিক কাজে ঢাকায় যাচ্ছেন। পরে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিষয়টি নিয়ে হাটহাজারী পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মুমিন বলেন, বিষয়টি দুঃখজনক।
তিনি জানান, প্রকল্পটি ২০২৫ সালে অনুমোদিত হয়েছিল। সে সময় তিনি পৌর প্রশাসকের দায়িত্বে ছিলেন না। একটি প্রকল্প গ্রহণের আগে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে এস্টিমেট ও বাজেট প্রস্তুত করা উচিত।
তিনি বলেন, শুধু ব্রিজ করলেই হবে না। ব্রিজের সঙ্গে সংযোগ সড়ক, মাটি ভরাটসহ আনুষঙ্গিক বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখতে হয়। সঠিক তথ্য ও প্রতিবেদন নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব।
স্থানীয়দের দুর্ভোগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার আশ্বাস দিয়ে ইউএনও বলেন, বিষয়টি তুলে ধরায় প্রতিবেদককে ধন্যবাদ। দু-এক দিনের মধ্যেই সমস্যাটির সমাধানে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।