রাঙ্গুনিয়ায় টানা ভারী বর্ষণে পাহাড়ধস; প্রাণ গেল নারীর

টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় নেমে এসেছে দুর্যোগ। পাহাড়ধসে এক নারীর মর্মান্তিক মৃত্যু, বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা, সড়কে ফাটল, গাছ উপড়ে পড়ে যান চলাচলে বিঘ্ন এবং দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বিভ্রাটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন।

সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে রাঙ্গুনিয়া পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের গুচ্ছগ্রাম এলাকায়, যেখানে ভয়াবহ পাহাড়ধসে রেনু বেগম (৫৫) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। তিনি মৃত নবীর হোসেনের স্ত্রী।

মঙ্গলবার (৭ জুলাই) বিকেলে টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে আকস্মিকভাবে ধস নামলে নিজ বসতঘরে থাকা রেনু বেগম মাটিচাপা পড়েন। স্থানীয়রা দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা শুরু করলেও ধসে পড়া বিপুল পরিমাণ মাটির কারণে তাকে বের করা সম্ভব হয়নি। পরে খবর পেয়ে রাঙ্গুনিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের একটি উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে অভিযান শুরু করে।

ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়, ওয়্যারহাউজ ইন্সপেক্টর অর্জুন বাড়ৈর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের উদ্ধারকারী দল প্রতিকূল আবহাওয়া ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেও অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে উদ্ধারকাজ পরিচালনা করে। বিশেষ উদ্ধার সরঞ্জাম ব্যবহার করে দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর বিকেল ৫টা ৪০ মিনিটে রেনু বেগমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া শেষে মরদেহটি রাঙ্গুনিয়া মডেল থানার এসআই জাকেরের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

ওয়্যারহাউজ ইন্সপেক্টর অর্জুন বাড়ৈ জানান, খবর পাওয়ার মাত্র সাত মিনিটের মধ্যে উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। টানা বৃষ্টি ও ধসের ঝুঁকি থাকায় অভিযান ছিল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। তবুও সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

রাঙ্গুনিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. তাহমিনা জানান, সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিটে রেনু বেগমকে হাসপাতালে আনা হলেও হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তার মৃত্যু হয়েছিল। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ঘটনার সময় প্রবল বর্ষণে পাহাড়ের ওপরের অংশ থেকে বিশাল মাটির স্তূপ নিচে নেমে এসে রেনু বেগমের বসতঘর চাপা দেয়। আকস্মিক এ ঘটনায় নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার কোনো সুযোগ না পাওয়ায় ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

এ ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, গুচ্ছগ্রামটি দীর্ঘদিন ধরেই পাহাড়ধসের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রতি বর্ষা মৌসুমেই পাহাড়ের মাটি আলগা হয়ে যায়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করলেও এখন পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে পুনর্বাসনের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

এদিকে একই দিন সকালে রাঙ্গুনিয়ার জিয়ানগর এলাকায় কাপ্তাই সড়কে অতিবৃষ্টির কারণে একটি বড় গাছ উপড়ে পড়ে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে গাছ অপসারণ করে স্বল্প সময়ের মধ্যে যান চলাচল স্বাভাবিক করেন।

শুধু পাহাড়ধসই নয়, টানা বর্ষণে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ব্যাপক দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন সড়কে ফাটল সৃষ্টি হয়েছে এবং অসংখ্য বাড়িঘর ও দোকানপাটে বৃষ্টির পানি ঢুকে পড়েছে। বিশেষ করে বেতাগী, ঢেমিরছড়া, পোমরা ছাইনীপাড়া, হাজীপাড়া, ইসলামপুর ইউনিয়ন, সরফভাটাসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। অনেক এলাকায় হাঁটুপানি জমে যাওয়ায় মানুষের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।

সকাল থেকে দফায় দফায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে জনজীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। বিদ্যুৎ না থাকায় বাসাবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন জরুরি সেবাও ব্যাহত হয়।

ঘটনার পর উপজেলা প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে সতর্ক থাকার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু সতর্কবার্তা নয়, স্থায়ী পুনর্বাসন ও ঝুঁকিপূর্ণ বসতি অপসারণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণই এখন সময়ের দাবি।

প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় পাহাড়ধসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটলেও স্থায়ী সমাধান এখনো অধরাই রয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিকল্পিত বসতি, পাহাড় কাটা, বন উজাড় এবং পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ফলে পাহাড়ধসের ঝুঁকি ক্রমাগত বাড়ছে। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারীদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে পুনর্বাসন, পাহাড় ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজরদারি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিকল্প নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আরও পড়ুন