সফিক চৌধুরী :: প্রতিবছর এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হলে শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্ট সকলের মধ্যেই ফলাফল নিয়ে কৌতুহলের পাশাপাশি যথেষ্ট আনন্দ-উচ্ছ্বাস থাকে, তেমনি কিছু ক্ষেত্রে থাকে হতাশাও। একজন শিক্ষার্থীর জীবনের প্রথম পাবলিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখা স্বাভাবিকভাবেই আনন্দের, অন্যদিকে যারা আশানুরূপ ফল করতে পারে না বা অকৃতকার্য হয়ে যায় তাদের জন্য সেটি হতাশার।
এ বছর অনুষ্ঠিত এসএসসি পরীক্ষার প্রকাশিত ফলাফলে দেখা গেছে, ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার ৬৪.০৫ শতাংশ। যা গত বছর ছিলো ৬৮ দশমিক ০৪ শতাংশ। অর্থাৎ পাসের হার ৩ দশমিক ৯৯ শতাংশ কমেছে। এছাড়া এ বছর জিপিএ–৫ পেয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ৯ জন পরীক্ষার্থী, যা গত বছর ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার ১৮ জন। এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে এবার দেশের ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কেউ পাস করতে পারেনি। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে যারা অংশ নিয়েছিল, তাদের সবাই অকৃতকার্য হয়েছে।
যে কোনো পাবলিক পরীক্ষায় পাসের হার কমবেশি হওয়ার পেছনে পারিপার্শ্বিক এমন কিছু প্রভাবক কাজ করে, যেগুলো বিশ্লেষণ করলে পরীক্ষার ফলের সংখ্যাগত হিসাব ছাপিয়ে আরও অনেক কিছু বড় হয়ে উঠে। এবার এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে এমন ধসের পেছনে মানবিক বিভাগের পরীক্ষার্থীদের ব্যর্থতা সামনে এসেছে। এ বছর মানবিক থেকে অংশ নেওয়া পরীক্ষার্থীদের পাসের হার মাত্র ৪৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ। হিসাবমতে, মানবিক বিভাগ থেকে পরীক্ষা দেওয়া প্রতি ১০০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৫১ জনের বেশি অকৃতকার্য হয়েছে। তারা ইংরেজি ও গণিতে অকৃতকার্য হয়েছে বেশি। মানবিকের শিক্ষার্থীদের অকৃতকার্যতার প্রভাব পড়েছে এসএসসি ও সমমানের গড় ফলাফলে। এ কারণে গড় পাসের হার কমেছে। জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বিগত বছরের তুলনায় কমে গেছে।
মানবিক বিভাগে এই যে প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী পাস করতে পারল না, এটা কোনোমতেই কাঙ্ক্ষিত নয়। এসএসসি পরীক্ষার সামগ্রিক ফলাফল আমাদেরকে একটি আয়নার সামনে দাঁড় করিয়েছে। তাতে আমরা বুঝতে পারছি, আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোতে কোথাও গলদ আছে। সেই গলদের জায়গাগুলো ঠিক করতে হবে। সেই দায়িত্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের, সেই দায়িত্ব বোর্ডের, সেই দায়িত্ব সরকার ও নাগরিক সমাজসহ আমাদের সকলের।
এবারের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল অনেককেই হয়তো কিছুটা বিস্মিত করেছে। কারণ, বছর দুয়েক আগেও আমরা দেখেছি, পাসের হার এবং জিপিএ-৫ এর ছড়াছড়ি। তাই, স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, ফলাফল কী হঠাৎ করেই এমন অধ:পতন হলো নাকি এটাই ছিল আমাদের লুকিয়ে রাখা বাস্তবতা? এমন প্রশ্নের উত্তর খুব একটা জটিল নয় বরং সহজই, কিন্তু আমাদের জন্য অস্বস্তিকর। বাংলাদেশে শেখার সংকট শুরু হয় খুব শুরুর দিকেই। প্রাক-প্রাথমিক স্তর থেকেই শেখার ঘাটতি তৈরি হয় এবং সেই ঘাটতি বছরের পর বছর সঞ্চিত হয়। কিন্তু আমরা দীর্ঘদিন এই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে চাইনি। আমরা এমন এক সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিলাম যেখানে সংখ্যাই সত্য হয়ে উঠেছিল-পাসের হারই ছিল সাফল্যের প্রতীক, জিপিএ-৫-এর সংখ্যা ছিল আত্মতৃপ্তির মানদণ্ড। শিক্ষায় সাফল্য ও ফলাফল ‘ভালো’ দেখাতে গিয়ে আমরা অজান্তেই শেখার প্রকৃত সংকট আড়াল করেছি।
যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় গণিত এবং ইংরেজিকে একটি দুর্বোধ্য ও কঠিন বিষয় হিসেবেই শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থাপন করানো হয়েছে। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া অধিকাংশ শিক্ষার্থীর কাছেই শিক্ষার একেবারে প্রাথমিক স্তর থেকেই এই দুটি বিষয় কঠিন ও জটিল বলে মনে হয়। অবশ্য শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, দু:খজনক হলেও সত্যি, অনেক অভিভাবক ও শিক্ষকরাও গণিতকে দুর্বোধ্য বলেই মনে করেন। শৈশব থেকেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয় যে, গণিত একটি কঠিন বিষয় এবং এতে তেমন কোনো আনন্দ নেই।
শিক্ষার একেবারে প্রাথমিক স্তর থেকে বহু শিক্ষার্থীর গনিত ভীতি ‘ফোবিয়া’র মত কাজ করে। যে কারণে দেখা যায়, প্রাথমিক স্তর থেকে অনেক শিক্ষার্থীর অঙ্কের ভিতটা কাঁচাই থেকে যায়। যোগ-বিয়োগ, গুণ-ভাগ দূরে থাক, সংখ্যা চিনতে পারে না এমন কিছু শিক্ষার্থীও প্রাথমিকের চৌকাঠ পেরিয়ে মাধ্যমিকে আসছে। ফলে উপরের শ্রেণিতে গিয়েও অঙ্কে ভীতি থেকেই যায়। আর তারই আঁচ পড়ছে এসএসসি পরীক্ষার সামগ্রিক ফলাফলে।
আমাদের দেশে বিগত পনেরো বছরে যত স্কুল তৈরি হয়েছে, যত শিক্ষক নিয়োগ হয়েছে এমন আগে কখনও হয়নি। কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই, ছেলেমেয়েরা শিখছে অতি সামান্য, শিক্ষার মান অনেকটাই নিম্নগামী। এর একটি কারণ হিসেবে বলা যায়, শিক্ষকদের একটা অংশ তাঁদের নিজেদের পড়ানোর বিষয়টি সম্পর্কে নিজেরাই তেমন জানেন না, যে কারনে শিক্ষার্থীদের বুঝানোতে ঘাটতি থেকে যায়। এছাড়া শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীরা কে কতটা বুঝল তা নিয়ে শিক্ষক-অভিভাবক নির্বিশেষে তেমন কেউই বিশেষ একটা মাথা ঘামায় না। কারণ, আমাদের শিক্ষা কারিকুলামে গোটা পড়াশোনাটাই সিলেবাস-মুখী, শিক্ষার্থী-মুখী নয়। দ্বিতীয়ত, নবীন শিক্ষকদের হাতে-কলমে শিক্ষা পাওয়ার ঘাটতিতো রয়েছেই। আমাদের দেশে বিদ্যায়তনগুলো শিক্ষার্থীদের জন্য একধরনের বাধ্যতার পরীক্ষা, দক্ষতার পরীক্ষা নয়। কোনও সমস্যার সমাধান করা, যুক্তি দিয়ে মত প্রতিষ্ঠা, ভাষায় আবেগের প্রকাশ, এগুলো শিক্ষার্থীরা পারছে কি না, তা নিয়ে আমাদের অনেক প্রতিষ্ঠানই মাথা ঘামায় না।
মনে রাখতে হবে, কোনও শিক্ষার্থীরই এই ক্ষমতা থাকে না যে, সে নিজে নিজেই তার বিষয়গুলো সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে পারবেন। তাই শিক্ষার্থীদের গনিত ও ইংরেজি বুঝানোর মূল দায়িত্বটা বর্তায় তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উপর। কিন্তু আমাদের দেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নিয়েই যেন তাদের দায় সারে। সেই পরীক্ষার ভিত্তিতে সে কতটা শিখতে পারল বা পারল না, তা নির্ধারিত করা হয়। যে পারল না, তাকে অনায়াসে ‘অকৃতকার্য’ ঘোষণা করিয়ে দেওয়াটাই আমাদের দেশে শিক্ষার্থী মূল্যায়নের মাপকাঠি। যে শিক্ষার্থী পরীক্ষায় পাশ করতে ব্যর্থ হল, তার ব্যর্থতা কী কী কারণে— এ ব্যবস্থা কিন্তু বেশিরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই বিশ্লেষণ করে না। শিক্ষার্থীতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আসে শিখতে। এখন সে যদি খারাপ ফলাফল করে, তার দায়টা তো সবার আগে বর্তানো উচিত আমাদের প্রচলিত এই শিক্ষাব্যবস্থার উপর। প্রায় শিক্ষাবিদরাই বলেন, শিক্ষার্থীরা আসলে পরীক্ষায় একা খারাপ ফলাফল করে না, খারাপ ফলাফল করে প্রতিষ্ঠান, খারাপ করেন শিক্ষক, অকৃতকার্য হয় শিক্ষাব্যবস্থা। অথচ পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার দায় একা ঘাড়ে নিতে হয় শিক্ষার্থীকে।
এসএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্যদের অনেকেরই প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া এখানেই হয়তো বন্ধ হয়ে যেতে পারে, বাকি জীবনে এ ব্যর্থতার দায় বহন করতে হবে। এর জন্য অনেকের জীবনে বিপর্যয়ও নেমে আসতে পারে। এমন খারাপ ফলাফল রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতি, দেশের মানবসম্পদেরও অপচয়। এসএসসি পরীক্ষায় ফেল করা মানে একজন পরীক্ষার্থীর বাকী জীবনের দু:খবোধ। এই ব্যথা, বেদনা ও ক্ষতি যাতে সর্বনিম্ন পর্যায়ে আনা যায়, সে বিষয়ে রাষ্ট্র ও সরকারতো বটেই নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমেরও যথাযথ ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। সেইসাথে শিক্ষার্থী-অভিভাবক নির্বিশেষে আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, পরীক্ষায় একটি-দুটি বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়া মানে পুরো জীবনটাই অকৃতকার্য হয়ে যাওয়া নয়, যেকোনো মানুষের জীবন ওঠা-নামার মধ্য দিয়েই পার করতে হয়। শুধু একাডেমিক পরীক্ষায় পাস করাটাই জীবনের মূল বিষয় নয়; বরং সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য আরও বেশি চেষ্টা করতে হবে।
লেখক : সফিক চৌধুরী, প্রাক্তন শিক্ষাকর্মী (সমন্বিত শিক্ষা-সংস্কৃতি কার্যক্রম, ফুলকি)