ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার ২ নং সদরদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে একই প্রতিষ্ঠানে অবস্থান, ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম, ম্যানেজিং কমিটিতে পারিবারিক বলয় সৃষ্টি, স্বামীর অনধিকার চর্চা এবং প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগে তদন্ত শুরু করেছে শিক্ষা প্রশাসন।
এসব অনিয়মের কারণে সরকারি ৯৯ লক্ষ টাকার বহুতল ভবন বরাদ্দ বাতিলসহ বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এলাকাবাসী, অভিভাবক এবং বিদ্যালয়ের আজীবন দাতা সদস্য মো: মনিরুল হক মোল্লা এ বিষয়ে প্রথমে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
পরবর্তীতে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের আদেশের প্রেক্ষিতে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা প্রশাসন বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেয়।
তদন্ত নোটিশ ও প্রশাসনের পদক্ষেপ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের স্মারক (জেপ্রাশিঅ/ফরিদ/২০২৬/১০২৩, তারিখ: ২৯/০৭/২০২৬ খ্রি.) মোতাবেক নগরকান্দা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের কার্যালয় থেকে স্মারক নং উপ্রাশিক্ষ/নগর/ফরিদ/২০২৬/৪১৬, তারিখ: ১২/০৮/২০২৬ খ্রি. মূলে একটি আনুষ্ঠানিক তদন্ত নোটিশ জারি করা হয়।
নোটিশের প্রেক্ষিতে নগরকান্দা উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ও তদন্ত কর্মকর্তা মো: জাহিদ হোসেন মোল্যা সরেজমিনে ০২ নং সদরদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে তদন্ত কার্যক্রমে উপস্থিত হয়ে উভয় পক্ষের সাক্ষ্য-প্রমাণ গ্রহণ করেন।
তদন্ত কর্মকর্তার নিকট অভিযোগকারীর বিস্তারিত জবানবন্দি তদন্তের অংশ হিসেবে বিদ্যালয়ের আজীবন দাতা সদস্য ও মূল অভিযোগকারী মো: মনিরুল হক মোল্লা অভিযোগের স্বপক্ষে বিস্তারিত লিখিত জবানবন্দি পেশ করেন। তাঁর লিখিত জবানবন্দি ও পূর্ববর্তী অভিযোগপত্রের সমন্বয়ে প্রধান শিক্ষিকার বিরুদ্ধে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো সুস্পষ্টভাবে উঠে আসে।
স্বামীর অবৈধ প্রাতিষ্ঠানিক হস্তক্ষেপ ও প্রভাব বলয়:
প্রধান শিক্ষিকার স্বামী এনায়েত হোসেন হেমায়েত (পিতা: আব্দুল হালিম) বিদ্যালয়ের কোনো বৈধ প্রশাসনিক বা আনুষ্ঠানিক পদে না থাকা সত্ত্বেও সার্বক্ষণিক প্রতিষ্ঠানে অনধিকার চর্চা ও অযাচিত কর্তৃত্ব খাটান। তিনি স্থানীয় সুবিধাবাদী কিছু ব্যক্তিকে জড়ো করে বিদ্যালয়ে নিজস্ব প্রভাব বলয় কায়েম করেছেন, যার ফলে সাধারণ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
ম্যানেজিং কমিটিতে পারিবারিকীকরণ ও ভুয়া ভাউচারে অর্থ আত্মসাৎ:
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির (SMC) নির্বাচনে সরকারি বিধি-বিধান লঙ্ঘন করে প্রধান শিক্ষিকা ও তাঁর স্বামীর ঘনিষ্ঠ স্বজনদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই পকেট কমিটির মাধ্যমে স্লিপ ফান্ড (SLIP), রুটিন মেইনটেন্যান্স, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা উপকরণ ও ওয়াশ ব্লকের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি অর্থের কাজ না করে ভুয়া ও মনগড়া বিল-ভাউচার তৈরি করে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হচ্ছে।
দাতা সদস্যকে অবমূল্যায়ন ও অধিকার খর্ব:
অভিযোগকারী বিদ্যালয়ের আজীবন দাতা সদস্য হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো কার্যক্রমে অবহিত করা হয় না। কোনো সাধারণ বা রেজুলেশন সভায় আমন্ত্রণ জানানো হয় না এবং তাঁর কোনো গঠনমূলক পরামর্শ গ্রহণ না করে সম্পূর্ণ একক কর্তৃত্বে প্রতিষ্ঠান চালানো হয়।
আদালতের নিষেধাজ্ঞা ও ৯৯ লক্ষ টাকার ভবন বাতিল:
বিদ্যালয় সংলগ্ন জমি নিয়ে বিজ্ঞ আদালতে দেওয়ানি মামলায় অভিযোগকারীর পক্ষে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা (Injunction) বলবৎ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিতে ইতিপূর্বে ৯৯ লক্ষ টাকার একটি সরকারি বহুতল ভবন বরাদ্দ করা হয়েছিল। প্রধান শিক্ষিকা ও তাঁর স্বামী সমঝোতার কোনো উদ্যোগ না নিয়ে বিষয়টি ইচ্ছাকৃতভাবে ঝুলিয়ে রাখেন। এর ফলে বরাদ্দকৃত ভবন প্রকল্পটি বাতিল হয়ে যায়। অথচ দাতা সদস্যের দাবি—বিদ্যালয়ের স্বার্থে তিনি উক্ত জমি সমঝোতার মাধ্যমে হস্তান্তর করতে প্রস্তুত ছিলেন।
দীর্ঘ ১৩ বছরের স্বেচ্ছাচারিতা ও শিক্ষার্থী শূন্যতা:
একই বিদ্যালয়ে দীর্ঘ প্রায় ১৩ বছর বহাল তবিয়তে থাকার সুযোগে প্রধান শিক্ষিকা প্রশাসনিক শৃঙ্খলা সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলেছেন। নিয়মিত ক্লাসে অনুপস্থিতি, পাঠদানে চরম অবহেলা এবং স্থানীয় দলীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতার কারণে ঐতিহ্যবাহী এই বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থী সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে।
জনদাবি ও প্রতিকার প্রার্থনা অভিযোগকারী তাঁর লিখিত জবানবন্দির সাথে আদালতের রায় ও স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার নথি, মূল অভিযোগপত্রের কপি এবং আজীবন দাতা সদস্য সংক্রান্ত যাবতীয় প্রমাণক তদন্ত কর্মকর্তার নিকট দাখিল করেন।
তিনি জোর দাবি জানান—বিদ্যালয়ের বিগত অর্থবছরগুলোর যাবতীয় আয়-ব্যয়ের ক্যাশবহি ও ভাউচার নিরপেক্ষভাবে বিশেষ অডিট করা হোক। পাশাপাশি বিদ্যালয়ের সার্বিক শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন সচল করতে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষিকাকে অনতিবিলম্বে স্থায়ীভাবে অপসারণ ও বদলির সুপারিশ যেন তদন্ত প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।