জি. এম সাইফুল ইসলামঃঃ টাইফয়েড জ্বর একটি ব্যাকটেরিয়াঘটিত রোগ এবং বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে এটি বেশি দেখা যায়। এই রোগের ঝুঁকি কমাতে টাইফয়েড কনজুগেট ভ্যাক্সিন (টিসিভি) ব্যবহার করা হয়, যা নির্দিষ্ট বয়সের শিশুদের জন্য খুবই কার্যকর।
দুষিত পানি পান বা ব্যবহার করার কারনে এটি বেশি হতে পারে। বর্ষা পরবর্তী দেশে পানি দূষণের মাত্রা অনেক ক্ষেত্রে বেডে যায়। সাম্প্রতিক ঘটনাবলী যেমন বন্যার পর টাইফয়েডের ঝুঁকি বাড়তে পারে, সেদিকে খেয়াল রেখে সরকার এ বছর প্রথমবারের মতো দেশের সকল শিশুকে বিনামূল্যে টাইফয়েড টিকাদানের ব্যবস্থা করেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) মতে, টাইফয়েড স্যালমোনেলা টাইফি (এস টাইফি) ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়, যা সাধারণত দূষিত খাদ্য বা পানি গ্রহণের মাধ্যমে ছড়ায়। এর উপসর্গের মধ্যে রয়েছে দীর্ঘস্থায়ী জ্বর, মাথাব্যথা, বমিভাব, ক্ষুধামন্দা, কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া। সাধারণত এটি দূষিত খাদ্য বা পানি গ্রহণের মাধ্যমে হয়ে থাকে। অনেক সময় উপসর্গগুলো প্রায়ই অস্পষ্ট থাকে। নিরাপদ পানি ও উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থার অভাবে রোগটি বেশি ছড়ায়।
প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ থেকে ২ কোটি ১০ লাখ মানুষ টাইফয়েডে আক্রান্ত হয় এবং প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়।
উন্নয়নশীল দেশের গ্রামাঞ্চলে যেখানে আধুনি স্যানিটেশন ব্যবস্থা নেই সেখানে টাইপয়েড জ্বর সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া, মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা এবং ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের দেশগুলি টাইপয়েড দ্বারা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জাপান, পশ্চিম ইউরোপ এবং অস্ট্রেলিয়ায় মতো উন্নত দেশগুলিতে রোগটি কম দেখা যায়। প্রাপ্ত বয়স্কদের তুলনায় শিশুদের টাইপয়েডে আক্রান্ত হওয়ার আশংকা সবচেয়ে বেশি।
যে-সব এলাকায় শিশুরা টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হয়, সে-সব এলাকায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সকল শিশুকে টিকা দেওয়ার পরামর্শ দেয়। এছাড়া উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে এমন ব্যক্তিদের টিকা দেওয়ার সুপারিশ করে। রোগের প্রাদুর্ভাব কমাতে টিকাদান অভিযান কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। টিকার উপর নির্ভর করে প্রতি তিন থেকে সাত বছরে অতিরিক্ত ডোজের প্রয়োজন হতে পারে।
টাইফয়েড ব্যাকটেরিয়া মোকাবেলায় সরকার সারা দেশে শিশু-কিশোরদের জন্য টাইফয়েড টিকাদান কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। আগামী ১২ অক্টোবর থেকে দেশব্যাপী শুরু হবে বিনামূল্যে টাইফয়েড টিকাদান কার্যক্রম।
এ কার্যক্রমের আওতায় সারা দেশে ৯ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সি প্রায় ৫ কোটি শিশু ও কিশোর-কিশোরী বিনা মূল্যে এই টিকা পাবে। টিকাদান কর্মসূচি মোট ১৮ কর্মদিবস চলবে। প্রথম ১০ দিন বিদ্যালয়ভিত্তিক ক্যাম্পে এবং পরবর্তী ৮ দিন টিকাদান কেন্দ্রে প্রদান করা হবে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় টাইফয়েড টিকা কার্যক্রম চলবে।
টিাকাদান কার্যক্রম সুষ্ঠু ও সুচারুরুপে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ ইতোমধ্যে কার্যক্রম শুরু করেছে। বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সকল শিশুর নিকট টিকা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে গত ১০ সেপ্টেম্বর তারিখে নোটিশ জারি করেছে। সে নোটিশে সকল পর্যায়ে সমন্বয় কমিটি গঠন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নোটিশে বলা হয়েছে আগামী ১২ অক্টোবর থেকে দেশব্যাপী ১৮ কার্যদিবস ‘টাইফয়েড টিকাদান ক্যাম্পেইন-২০২৫’ উদযাপন করা হবে। এ ক্যাম্পেইনের উদ্দেশ্য হচ্ছে শিশুদের টাইফয়েড সংক্রমনজনিত অসুস্থতা ও মৃত্যুহার বহুলাংশে হ্রাসকল্পে দেশব্যাপী ক্যাম্পেইন চলাকালে ৫ কোটির শিশুর প্রত্যেককে ১ ডোজ টাইফয়েড টিকা প্রদান করা। এ টিকাদান কার্যক্রমের অংশ হিসেবে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত ১৫ বছরের কম বয়সী সকল শিক্ষার্থীকে স্ব স্ব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বহির্ভূত ৯ মাস বয়স থেকে ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের বিদ্যমান ইপিআই স্থায়ী ও অস্থায়ী টিকাদান কেন্দ্রে টাইফয়েড টিকা প্রদান করা হবে।
স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের গত ১৪ আগস্ট ২০২৫ তারিখের Inter Agency Co-Ordination Committee (ICC) এর সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক ১০ সেপ্টেম্বর তারিখের নোটিশের মাধ্যমে বিভাগ পর্যায়ে বিভাগীয় কমিশনারকে সভাপতি ও বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালককে সদস্য সচিব করে ৯ সদস্যের ‘বিভাগীয় সমন্বয় কমিটি’, জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসককে সভাপতি ও সিভিল সার্জনকে সদস্য সচিব করে ১২ সদস্যের ‘জেলা সমন্বয় কমিটি’ এবং উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে সভাপতি ও উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাকে সদস্য সচিব করে ৯ সদস্যের ‘উপজেলা সমন্বয় কমিটি’ গঠন করা হয়েছে। প্রদত্ত নির্দেশনায় প্রত্যেকটি কমিটির কার্য পরিধিও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। কমিটি কাজের সুবিধার্থে যেকোন ব্যক্তিকে কো-অপ্ট করতে পারবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে সে নির্দেশনায়।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির তথ্য মতে, এই টিকা এক ডোজের ইনজেকশনে দেয়া হবে, যা ৩ থেকে ৭ বছর পর্যন্ত সুরক্ষা দেবে। টিকাগুলো গ্যাভি ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স সরবরাহ করেছে এবং ভারতের তৈরি। এটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী শতভাগ পরীক্ষিত। তবে এর জন্য প্রথমে নিবন্ধন করতে হবে।
রেজিস্ট্রেশন করতে হলে https://vaxepi.gov.bd/registration/tcv ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে জন্ম তারিখ ও ১৭ সংখ্যার জন্ম নিবন্ধন নম্বর (সব তথ্য ইংরেজিতে) দিতে হবে। এরপর লিঙ্গ নির্বাচন, ক্যাপচা পূরণ করে পরবর্তী ধাপে যেতে হবে।
দ্বিতীয় ধাপে মা-বাবার মোবাইল নম্বর, ই-মেইল, পাসপোর্ট নম্বর (যদি থাকে) ও বর্তমান ঠিকানা দিয়ে তথ্য জমা দিতে হবে। এরপর মোবাইলে পাওয়া ওটিপি কোড দিয়ে রেজিস্ট্রেশন নিশ্চিত করতে হবে।
রেজিস্ট্রেশনের সময় টাইফয়েড টিকা নির্বাচন করে ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক’ বা ‘বহির্ভূত’ অপশন বেছে নিতে হবে। স্কুলভিত্তিক হলে প্রতিষ্ঠানের নাম, ঠিকানা, শ্রেণি, থানা, ওয়ার্ড ও জোন পূরণ করে নির্ধারিত টিকাদান কেন্দ্র নির্বাচন করতে হবে। বহির্ভূত ক্ষেত্রে নিকটস্থ কেন্দ্র বেছে নিতে হবে।
রেজিস্ট্রেশন শেষে অনলাইনে ভ্যাকসিন কার্ড ডাউনলোড করে প্রিন্ট নিতে হবে। নির্ধারিত দিনে এই কার্ড নিয়ে টিকাদান কেন্দ্রে উপস্থিত হতে হবে। টিকা নেওয়ার পর অনলাইনে সার্টিফিকেট পাওয়া যাবে, যা ডাউনলোড করে সংরক্ষণ করা যাবে।
সারাদেশের মতো চট্টগ্রামেও টাইফয়েড টিকা কার্যক্রম শুরু হবে ১২ অক্টোবর থেকে। চট্টগ্রামেও টাইফয়েড টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
প্রথমবারের মতো সরকারের বিনামূল্যে এই টিকাদান কর্মসূচিতে চট্টগ্রাম জেলা ও সিটি কর্পোরেশন মিলে মোট প্রায় ২২ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে জানা গেছে, জেলার ১৫ উপজেলা পর্যায়ে ৯ মাস থেকে ১৫ বছরের কম বয়সী প্রায় ১৩ লাখ শিশুকে টাইফয়েড টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। শুরুতে ১ সেপ্টেম্বর ক্যাম্পেইন শুরুর পরিকল্পনা থাকলেও তা পিছিয়ে আগামী ১২ অক্টোবর থেকে কার্যক্রম শুরু হবে। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ৮ লাখ ১৯ হাজার ৫৯২ জন শিশুকে টিকা দেওয়ার প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রথম ১০ দিন স্কুল ও মাদ্রাসায় ক্যাম্প করে এবং পরবর্তী ৮ দিন ইপিআই সেন্টারে টিকা দেওয়া হবে।
টাইফয়েড ভ্যাকসিনের এই এক ডোজের ইনজেকটেবল ভ্যাকসিন শিশুদের ৩ থেকে ৭ বছর পর্যন্ত সুরক্ষা দেবে। গ্যাভি ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্সের সহায়তায় আনা হয়েছে টিকাটি, যা প্রথমবারের মতো বিনামূল্যে দিচ্ছে সরকার।
সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের উচিত দ্রুত রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম সম্পন্ন করে নিজ নিজ শিশুকে টিকা দিয়ে সুরক্ষিত করা। আর যাদের ১৫ বছরের কম বয়সী শিশু নেই তারা প্রতিবেশীকে এ বিষয়ক প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করতে পারেন, সুরক্ষিত করতে পারেন পরিবার, সমাজ ও দেশকে।
লেখকঃ জি. এম সাইফুল ইসলাম, তথ্য অফিসার, চট্টগ্রাম পিআইডি
(চট্টগ্রাম পিআইডি ফিচার)