সাউথ আফ্রিকায় সুপার শপ গড়ে তুলেছেন ছালা উদ্দিন। সেখানে তার ব্যবসা জীবনের ১৬ বছরের পথচলা। এই পথচলায় ছেলেকেও সহযোগী হিসেবে পাশে রাখতে চেয়েছিলেন। সেলক্ষ্যে বড় ছেলে সাইফুদ্দিন মাহমুদ রায়হানকেও সাউথ আফ্রিকায় নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেন।
কিন্তু সেই কঠিন পথ পাড়ি দেওয়া হলো না, দালালের খপ্পরে পড়ে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের রায়হান দক্ষিণ আফ্রিকার জাম্বিয়া পাহাড়ে মৃত্যুবরণ করেন। নিরাপদ মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়ার নাম করে দালাল চক্র পরিবারের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন লাখ লাখ টাকা, বিনিময়ে ছেলের লাশের সন্ধানও পাচ্ছেন না বাবা-মা।
স্বজনদের অভিযোগ যেই পাহাড়ে তার মৃত্যু হয় সেই পাহাড়ে তাকে পুঁতে ফেলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রায়হানের সফরসঙ্গীরা।
রায়হানের পরিবার সূত্রে জানা যায়, মিরসরাই উপজেলার কাটাছরা ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম দুর্গাপুর গ্রামের দরবেশ আলী সারেং বাড়ির বাসিন্দা আফ্রিকা প্রবাসী ছালা উদ্দিনের বড় ছেলে সাইফুদ্দিন মাহমুদ রায়হান (২১)। আফ্রিকায় বাবার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে সহযোগী হওয়ার জন্য দক্ষিণ আফ্রিকায় যাওয়ার জন্য ৯ লাখ টাকা চুক্তি হয়, ইতিমধ্যে দালাল চক্রের একজন নোয়াখালীর জনৈক জয়নাল আবেদীন ফারুককে ৫ লাখ টাকা দেন। বাকি টাকা সাউথ আফ্রিকায় পৌঁছলে দেওয়ার কথা ছিল।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর নিহত রায়হানসহ ৬ তরুণ ঢাকার চানখারপুল এলাকায় দালাল চক্রের অন্য একজন মুনিম শাহরিয়া থেকে পাসপোর্ট আর এয়ারটিকেট বুঝে নেন। কথা ছিল তাদের দুবাই অথবা কাতার বিমানবন্দর ট্রানজিট হয়ে আফ্রিকা পৌঁছানোর। কিন্তু দালাল চক্রটি তাদের নিয়ে যায় ইথিওফিয়াতে। সেখান থেকে সড়ক পথে গাড়িতে বর্ডার রোডে পায়ে হেঁটে মালাও থেকে কঙ্গো পৌঁছায়। পরবর্তীতে কঙ্গোর বর্ডার এলাকা থেকে দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল জাম্বিয়াতে পায়ে হেঁটে যাওয়ার পথে অসুস্থ হয়ে পড়ে রায়হান। তার সফরসঙ্গীদের ভাষ্যমতে এসময় তাদের পথ দেখানোর কাজে জড়িত স্থানীয় কৃষ্ণাঙ্গ লোকজন তাকে কাঁধে করে কিছু পথ নেওয়ার পর তার শারীরিক অবস্থার অবণতি ঘটে। এসময় তারা কাঁধ থেকে জোরে নিচে ফেলে দিলে সে তখন জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষনে পৌঁছে যায়। তখন রায়হানের অন্য সফরসঙ্গীদের পথ আগাতে বলেন কৃষ্ণাঙ্গ লোকজন। পরে তারা শুনতে পারেন সেখানেই তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগে রায়হানের সফরসঙ্গীদের সাথে শেষ কথা ছিল ‘আমার পাসপোর্ট আর জুতাজোড়া আব্বুর কাছে পৌঁছে দিয়েন।’
রায়হান গত বুধবার (৬ অক্টোবর) মারা গেলেও মৃত্যুর ৭ দিন পর গত সোমবার দিবাগত রাত ১ টায় পরিবার তার মৃত্যুর খবর শুনতে পায়।
এদিকে পরিবারের বড় ছেলের মৃত্যুর সংবাদ শুনে মা শামীমা আক্তার বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। আদরের বড় নাতীর স্মৃতি আওড়িয়ে দাদী খাটে বসে করছেন বিলাপ। শান্তনার বার্তা দিতে গ্রামের বাড়িতে দেখা গেছে স্বজনদের ভিড়।
নিহত রায়হানের দাদী শামসুন্নাহার বিলাপ করতে করতে বলেন, আমার শান্তশিষ্ট নাতিটা কেমনে হারাই গেলো। অল্প বয়সে গায়েগতরে বড় হয়ে গেছিল। আব্বার কাজের সহযোগী হতে গিয়ে আল্লাহর জিম্মায় চলে গেছে।
নিহত রায়হানের মামাতো ভাই নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া আইনুল হাসনাত রাজু বলেন, ‘রায়হানের মৃত্যুর খবর সর্বপ্রথম গত সোমবার দিবাগত রাত ১ টায় পাই। পরবর্তীতে তার সফরসঙ্গীদের সাথে যোগাযোগ করলে তারা তার মৃত্যুর বর্ননা দেন। তবে লাশ কোথায় আছে কেউ বলতে পারছে না, দালালরা ফোনও ধরছে না। তার সফরসঙ্গীরা জানান তাকে মেরে জাম্বিয়া পাহাড়ে পুঁতে ফেলেছে। সরকারের কাছে দালালদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানাই।’
রায়হানের জেঠা কামাল উদ্দিন বলেন, ‘যেকোন মূল্যে আমরা তার লাশ চাই। আমার ভাইয়ের বউ (রায়হানের মা) রায়হানের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকে এক ফোঁটা পানিও মুখে নেয়নি, বারবার অচেতন হয়ে পড়ছেন। যেভাবেই হোক সরকারের কাছে আকুল আবেদন আমাদের ছেলের মরদেহ আমাদের ব্যবস্থা করে দিন এবং দালাল চক্রের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।’