১ম পর্বের পর……
বদলি-পদায়নে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ, পছন্দের কর্মস্থলে পোস্টিং, কথিত মাসোহারা আদায়, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং বিপুল সম্পদের তথ্য—বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) চিফ কমান্ড্যান্ট মো. জহিরুল ইসলামকে ঘিরে অভিযোগের পরিধি যেন ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। এসব অভিযোগের পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর সাংবাদিককে মামলার হুমকি দেওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে।
জানা যায়, জহিরুল ইসলাম ১৯৯০ সালে সাঁটমুদ্রাক্ষরিক কাম টাইপিস্ট পদে বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে চাকরিতে যোগ দেন। ২০০০ সালে দ্বিতীয় শ্রেণির পদে পদোন্নতি পান তিনি। এরপর ২০০২ সালের ১০ সেপ্টেম্বর বিসিএস নন-ক্যাডারের ২১তম ব্যাচে সহকারী কমান্ড্যান্ট, ২০০৬ সালে কমান্ড্যান্ট এবং ২০২০ সালে চিফ কমান্ড্যান্ট পদে পদোন্নতি পান।
দায়িত্বের সঙ্গে বাস্তব চিত্রের ফারাকঃ
চিফ কমান্ড্যান্ট হিসেবে রেলওয়ের সম্পত্তি ও নগদ অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অপরাধ দমন ও নিয়ন্ত্রণের নীতিমালা প্রণয়ন, রাজস্ব ফাঁকি রোধ, বাহিনীর শৃঙ্খলা ও প্রশাসন বজায় রাখা, সদস্যদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা, জনবল ব্যবস্থাপনা এবং বাহিনীর সব স্তরের কার্যক্রম তদারকির মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করার কথা তাঁর।
তবে বাহিনীর সদস্যদের একাংশের অভিযোগ, এসব দায়িত্ব পালনের বিপরীতে বদলি-পদায়ন ও বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে ভিন্ন এক চিত্র তৈরি হয়েছে।
বদলির আশ্বাসে লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগঃ
আরএনবির সদস্যদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে—উপরমহলের সুপারিশের পাশাপাশি অর্থের বিনিময়ে পছন্দের বা সুবিধাজনক কর্মস্থলে বদলি পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। শুধু বদলির আশ্বাস দিয়ে অর্থ নেওয়াই নয়, টাকা নেওয়ার পর আরও বেশি অর্থের বিনিময়ে অন্য সদস্যকে একই পদে বদলি করার ঘটনাও ঘটেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরএনবির এক ইন্সপেক্টর অভিযোগ করেন, পছন্দের জায়গায় বদলির আশ্বাস দিয়ে চিফ কমান্ড্যান্ট মো. জহিরুল ইসলাম তাঁর কাছ থেকে ২ লাখ টাকা নিয়েছেন। পরে ওই স্থানে অন্য একজনকে বদলি করা হয়। তাঁর দাবি, বদলি না হওয়ার পাশাপাশি দেওয়া টাকাও ফেরত পাননি তিনি।
বাহিনীর আরেক সদস্য বলেন, আগের কর্মস্থলে এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই তাঁকে হঠাৎ বদলি করা হয়। কারণ জানতে চাইলে তাঁকে বলা হয়, ওই পদে অন্য একজনের জন্য ওপরমহল থেকে সুপারিশ রয়েছে। পরে বদলি ঠেকানোর আশ্বাস দিয়ে তাঁর কাছে এক লাখ টাকা দাবি করা হয়। তিনি বাহিনীরই একজন সদস্যের মাধ্যমে সেই টাকা দেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বদলি ঠেকানো যায়নি এবং টাকাও ফেরত দেওয়া হয়নি বলে তাঁর অভিযোগ।
১৮ লাখ টাকা ফেরতের ঘটনাঃ
আরএনবি সূত্রের দাবি, পশ্চিমাঞ্চলে দায়িত্ব পালনের আগে জহিরুলের একটি অর্থনৈতিক অনিয়মের ঘটনাকে কেন্দ্র করে কয়েকজন সদস্যকে প্রায় ১৮ লাখ টাকা ফেরত দেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়।
একটি প্রশ্ন রয়েই যায়, ১৮ লাখ টাকা কীসের ছিল?
সূত্রগুলোর দাবি, বদলি-পদায়নের আশ্বাসে বাহিনীর বিভিন্ন সদস্যের কাছ থেকে ওই অর্থ নেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে চিফ কমান্ড্যান্টের হঠাৎ বদলি হয়ে যাওয়ায় অর্থ দেওয়ার পরও প্রত্যাশিত বদলি সম্ভব হয়নি। এতে ক্ষুব্ধ সদস্যরা তাঁর অফিসে গিয়ে টাকা ফেরতের দাবি জানান।
এ ঘটনায় বাহিনীর সদস্যদের প্রতিনিধি হিসেবে ‘সাদ্দাম’ নামের এক সদস্য কথা বলেন। বিষয়টি নিয়ে মধ্যস্থতা করেন রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা (এও) ইমাম হোসেন উজ্জ্বল।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইমাম হোসেন উজ্জ্বল বলেন, “ঘটনাটি সত্যি। বাহিনীর লোকদের পক্ষ হয়ে আমি স্যারের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তারা টাকাও ফেরত পেয়েছে। আমি মধ্যস্থতা করে বাহিনীর উপকার করেছি। এটা অস্বীকার করার কিছু নেই।”
জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তাঁর ও তাঁর পরিবারের সম্পদ নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্য।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ২৯ মে ঢাকার মিরপুরের সেনপাড়া মৌজায় জহিরুল ইসলামসহ ৩৫ জন একটি বাড়ি ক্রয় করেন। দলিলমূল্য ছিল ৪ কোটি ৮৮ লাখ ৮৮৮ টাকা। এর মধ্যে জহিরুল ইসলাম ২ কোটি টাকা দেন বলে অনুসন্ধান-সংক্রান্ত তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।
এ ছাড়া ঢাকার শহীদবাগে এএনজেড প্রোপার্টিজ লিমিটেডের নয়তলা ‘সিপ্রিং ডেল’ ভবনের দ্বিতীয় তলায় ১ হাজার ৫০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট কেনেন তিনি। ফ্ল্যাটটির ক্রয়মূল্য প্রায় ৮০ লাখ টাকা হলেও বর্তমানে এর বাজারমূল্য আরও বেশি বলে সংশ্লিষ্ট তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঢাকার উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের ‘এ’ ব্লকে রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পেও ১ হাজার ৬৫৪ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট জহিরুল ইসলামের নামে রয়েছে বলে তথ্য পাওয়া যায়। এর মূল্য প্রায় ৬৫ লাখ টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
চিফ কমান্ড্যান্ট পদে পদোন্নতির পরপরই প্রায় ৩৫ লাখ টাকা মূল্যে একটি গাড়ি কেনার তথ্যও রয়েছে। গাড়িটির নম্বর ঢাকা-মেট্রো-গ-৪২-০৮৭১।
স্ত্রীর নামেও একাধিক সম্পদের তথ্যঃ
দুদকের অনুসন্ধানে জহিরুল ইসলামের স্ত্রী কাজী জিন্নাতুন নাহারের সম্পদের তথ্যও উঠে আসে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালে কুমিল্লার আদর্শ সদর থানাধীন কান্দিরপাড়ের ঝাউতলা মৌজায় ‘রহমান লজ’ নামের পাঁচতলা ভবনের পঞ্চম তলায় প্রায় ২০ লাখ টাকা মূল্যের একটি ফ্ল্যাট কেনেন তিনি।
২০১৮ সালে একই মৌজায় ‘জয়েন্ট লাইফ এস এস গার্ডেন’ নামের ১০তলা ভবনের চতুর্থ তলায় প্রায় ২০ লাখ টাকা মূল্যের আরেকটি ফ্ল্যাট কেনার তথ্যও অনুসন্ধানে পাওয়া যায়।
এ ছাড়া ঢাকার রমনা থানার কাকরাইলের সার্কিট হাউস রোডে ‘কনকর্ড গ্র্যান্ড রুবি’ নামের ১৪ তলা আবাসিক ভবনের চতুর্থ তলায় ১ হাজার ৭৫০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট রয়েছে তাঁর নামে। এর ক্রয়মূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা বলে সংশ্লিষ্ট তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।
২০১৭ সালের ১৮৫ সিপাহী নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগঃ
২০১৭ সালে ১৮৫ জন আরএনবি সিপাহী নিয়োগকে কেন্দ্র করে অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগও রয়েছে জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান ও মামলা হয়। তবে জহিরুল ইসলামের দাবি, ২০২৫ সালের ৩ নভেম্বর মামলাটির নিষ্পত্তি হয়েছে।
মামলার নথি অনুযায়ী, মুক্তিযোদ্ধা কোটায় লিখিত পরীক্ষায় ২৫ নম্বরের বেশি পাওয়া ১৪ জন যোগ্য প্রার্থীর মধ্যে পাঁচজনকে অকৃতকার্য দেখানোর অভিযোগ রয়েছে।
নথিতে তাঁদের লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার সম্মিলিত নম্বর ২০ দশমিক ২ থেকে ২৪ দশমিক ৪ পর্যন্ত ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে লিখিত পরীক্ষায় সরাসরি অকৃতকার্য নয়জন প্রার্থীর নম্বর কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে তাঁদের উত্তীর্ণ দেখানো এবং পরবর্তীতে চাকরির ব্যবস্থা করার অভিযোগও মামলার তথ্যে রয়েছে।
জেলা ও পোষ্য কোটাতেও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত নিয়ম উপেক্ষা করে মেধাতালিকা বাতিল এবং এক জেলার প্রার্থীর পরিবর্তে অন্য জেলার প্রার্থীকে নিয়োগ দিয়ে কোটা পূরণের অভিযোগও নথিতে উল্লেখ করা হয়েছিলো।
দপ্তরাদেশের অনুমোদন কাঠামো নিয়েও প্রশ্নঃ
বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ২০২৪ সালের ৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালকের কার্যালয় থেকে সংশোধিত নির্দেশিকা ও দপ্তরাদেশ জারি করা হয়।
দপ্তরাদেশ অনুযায়ী, গ্রেড-১০ থেকে গ্রেড-২০ পর্যন্ত কর্মচারীদের আন্তঃজোনাল বদলির ক্ষেত্রে মহাপরিচালকের অনুমোদন প্রয়োজন। একই বিভাগের মধ্যে বদলি বা পদায়নের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট অঞ্চল বা জোনের মহাব্যবস্থাপকের লিখিত প্রশাসনিক অনুমোদনের বিষয়টি নির্দেশনায় রয়েছে।
তবে গত কয়েক বছরে আরএনবিতে জারি হওয়া একাধিক বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে এই অনুমোদন কাঠামো যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
শীর্ষ পদে থেকেও নেন কথিত মাসোহারাঃ
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা বাহিনীর চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের অস্ত্র শাখা, জেনারেল শাখা, গোয়েন্দা শাখা, চট্টগ্রাম গুডস পোর্ট ইয়ার্ডসহ বিভিন্ন সার্কেলে অবৈধ স্থাপনা, ডিউটি বণ্টনে অনিয়ম, টি/এ-ডি/এ বিল-ভাউচার নিয়ে অনিয়ম, কথিত ‘ভগবান ডিউটি’ এবং টিকিট কালোবাজারিসহ বিভিন্ন অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
এসব কর্মকাণ্ড থেকে কথিত মাসোহারা বা অবৈধ অর্থের একটি আলাদা ফান্ড পরিচালিত হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের দাবি, এসব অর্থের একটি অংশ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রচলন রয়েছে। তাঁদের অভিযোগ অনুযায়ী, কর্মকর্তাদের পদমর্যাদা অনুযায়ী অর্থের হার ৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে থাকে।
বদলি-পদায়নে অর্থ ও স্বার্থের লেনদেনের অভিযোগঃ
বাহিনীর বেশ কয়েকজন সদস্যের দাবি, পূর্বাঞ্চলে দায়িত্ব নেওয়ার পর গত এক বছরে ৮ শতাধিক আরএনবি সদস্যকে বদলি করা হয়েছে। এসব বদলি ও পদায়নের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অর্থ বা ব্যক্তিগত স্বার্থের সংশ্লিষ্টতা ছিল।
বাহিনীর সদস্যদের দেওয়া তথ্যমতে, পছন্দের কর্মস্থলে যাওয়া, গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পদায়ন পাওয়া কিংবা বদলির আদেশ ঠেকাতে ৩০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, সিপাহীর ক্ষেত্রে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা, পোস্টিং হাবিলদারের ক্ষেত্রে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দায়িত্ব পেতে ১ লাখ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয় ঘুষ।
এদিকে সাব-ইন্সপেক্টরের ক্ষেত্রে ৬০ থেকে ৮০ হাজার টাকা এবং চিফ ইন্সপেক্টরের ক্ষেত্রে ১ লাখ ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থ লেনদেনের অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চিফ কমান্ড্যান্টের কার্যালয়ে গেলেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। কারণ, তার কার্যালয় থেকে সাংবাদিকরা গেলে নিয়মিতই জানানো হয়—তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলবেন না।
এদিকে প্রথম পর্বের প্রতিবেদন প্রকাশের পর জহিরুল ইসলাম প্রতিবেদকের মোবাইল নম্বর ব্লক করে একটি ক্ষুদে বার্তা পাঠান। বার্তায় তিনি প্রশ্ন করেন, “আপনার নিবন্ধন আছে? আপনি কোনো সাংবাদিক নন।” এরপর তিনি প্রতিবেদকের নম্বরটি পুনরায় ব্লক করে দেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রতিবেদককে মামলার হুমকিও দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে বক্তব্য নিতে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপকের (জিএম) কার্যালয়ে গেলেও তিনি বিভিন্ন বৈঠকে ব্যস্ত থাকায় তার সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।