রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) হাবিলদার ইউসুফ আলী মৃধার বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালনের বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়ম, ডিউটি বণ্টনের নামে অর্থ আদায়, টি/এ-ডি/এ বিল ও কথিত ‘ভগবান ডিউটি’ দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ এবং বর্তমানে পাহাড়তলী রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় অবৈধ স্থাপনা থেকে মাসোহারা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে আরএনবির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শাখায় দায়িত্ব পালনের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করেছেন তিনি।
২০০০ সালে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সিপাহী হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন ইউসুফ আলী মৃধা। যোগদানের ৬ বছরের মধ্যে ২০০৬ সালে নায়েক পদে পদোন্নতি পান তিনি। অভিযোগ রয়েছে, ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করার পর আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তৎকালীন রাউজানের সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরীর ঘনিষ্ঠজন হিসেবে অত্যান্ত প্রভাবের সাথে চাকুরী করে গেছেন তিনি। এরপর ২০১৪ সালে হাবিলদার পদে পদোন্নতি পেয়ে আরএনবির অস্ত্র শাখা (এবি) ও গোয়েন্দা শাখায় (আইবি) দায়িত্ব পালন করেন।
জানা যায়, অস্ত্র শাখায় দায়িত্ব পালনকালে ডিউটি বণ্টনকে কেন্দ্র করে টি/এ-ডি/এ বিল এবং কথিত ‘ভগবান ডিউটি’র মাধ্যমে অর্থ আদায়ের সুযোগ তৈরি করেন ইউসুফ। বাহিনীর সদস্যদের প্রকৃত দায়িত্ব পালনের বাইরে কাগজে-কলমে ডিউটি দেখানো, ডিউটি বণ্টনের ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া এবং এর বিনিময়ে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
গোয়েন্দা শাখায় হাবিলদার হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়ও একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। সূত্রের দাবি, ডিউটি বণ্টনের নামে সদস্যদের বিভিন্ন ধরনের সুবিধা দেওয়া, টি/এ-ডি/এ বিল উত্তোলন, ট্রেনের ডিউটি দেখানো এবং বিভিন্ন স্থানে সদস্যদের উপস্থিতি দেখিয়ে হাজিরা দেওয়ার মতো অনিয়মের সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন। এর আগে এসব বিষয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ পেলেও তার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। তারা জানান, তৎকালীন রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তিনি বারবার পার পেয়ে যান।
এদিকে, জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিকভাবে আত্মগোপনে থাকার অভিযোগ থাকলেও পরবর্তীতে বদলি হয়ে পাহাড়তলী রেলওয়ে স্টেশনে হাবিলদার হিসেবে দায়িত্ব নেন ইউসুফ আলী মৃধা। সেখানে দায়িত্ব নেওয়ার পরও তার বিরুদ্ধে পুরোনো অভিযোগের ধারাবাহিকতা বজায় থাকার দাবি করেছেন স্থানীয় কয়েকজন।
অভিযোগ রয়েছে, পাহাড়তলী স্টেশন এলাকার আশপাশের রেলের জায়গায় গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা, দোকানপাট ও বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিদিনের হিসাব কিংবা মাসিক মাসোহারা নির্ধারণ করে অর্থ আদায় করা হচ্ছে। কৈবল্যধাম রেলগেট এলাকার মাছ ও কাঁচাবাজার এবং কয়েকটি অবৈধ স্থাপনা থেকে মাসিক প্রায় ৩ হাজার টাকা, সিডিএ মার্কেট রেলগেট এলাকার কয়েকটি ভাতের হোটেল ও অবৈধ স্থাপনা থেকে প্রায় ২ হাজার টাকা করে আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
পাহাড়তলী পুলিশ ফাঁড়ির পেছনে রেলওয়ের জায়গা ঘিরে লোহার দোকান, ডিপো, টং দোকান, ভাঙারি ও স্ক্র্যাপের দোকানসহ বিভিন্ন স্থাপনা থেকে মাসে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়। এসব জায়গা থেকে মাসে প্রায় ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে ইউসুফ আলী মৃধার বিরুদ্ধে। একইভাবে পাহাড়তলী স্টেশনের আশপাশের অবৈধ স্থাপনা থেকে মাসে প্রায় ৫ হাজার টাকা আদায় করেন তিনি—এমন অভিযোগও রয়েছে।
এ ছাড়া পাহাড়তলী ডিজেল শপ থেকে চুরি হওয়া তেলের একটি অংশ এবং পাহাড়তলী ওয়ার্কশপের পেছনের একটি ছোট জঙ্গলকে ঘিরেও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, ওই এলাকায় আশপাশের কয়েকজন ডিলারের মাদক সংরক্ষণের স্থান রয়েছে। সেখান থেকেও মাসিক ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা নেওয়া হয় বলে জানা যায়।
পাহাড়তলী বাজারের আশেপাশে ও স্টেশন এলাকা মাদক বিক্রির স্পট হিসেবেও চিহ্নিত। এলাকাবাসীর অভিযোগ, রেলওয়ের জায়গায় মাদক বিক্রির সুযোগ দেওয়ার বিনিময়ে আরএনবির কিছু সদস্য নিয়মিতভাবে এর একটি অংশ পেয়ে থাকেন। সাপ্তাহিক ভিত্তিতে অর্থ আদায়ের বিনিময়ে রেলের জায়গায় মাদক বিক্রির সুযোগ দেওয়া হয় বলে জানান তারা।
বদলি বাণিজ্য নিয়েও প্রশ্ন
তবে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়—একজন হাবিলদার চাইলেই কি অন্যত্র বদলি হতে পারেন? সংশ্লিষ্টদের দাবি, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল নিরাপত্তা বাহিনীতে বর্তমানে চলছে বদলি বাণিজ্য।
অভিযোগ রয়েছে, চিফ কমান্ড্যান্টের কাছে উপরমহলের মাধ্যমে সুপারিশ করে টাকা পৌঁছাতে পারলেই হাবিলদার, সিআই কিংবা সিপাহীরা সুবিধাজনক স্থানে বদলি হতে পারেন। বিষয়টি বাহিনীর সদস্যদের মধ্যেও আলোচিত রয়েছে।
শুধু তাই নয়, বদলির জন্য টাকা নেওয়ার পর বেশি টাকা পাওয়ায় বাহিনীর অন্য সদস্যকে বদলি করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে অনেক। প্রতিবেদকের কঅভিযুক্তদের এমন কয়েকটি বক্তব্য সংরক্ষিত রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, নিরাপত্তা বাহিনীর একজন ইনসপেক্টরকে বদলির আশ্বাস দিয়ে তার কাছ থেকে জহিরুল ইসলাম ২ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। পরবর্তীতে উপরমহলের চাপে ও বাড়তি টাকার লোভে বাহিনীর অন্য এক সদস্যকে বদলি করা হয়। এমনকি বদলির আশ্বাসে টাকা দেওয়া ব্যক্তিকেও তার টাকা ফেরত দেওয়া হয়নি বলে জানান ভুক্তভোগী।
এসব অভিযোগের বিষয়ে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃপক্ষ গণমাধ্যমের সাথে কথা বলতে রাজি হননি। তাদের অফিসে গেলে সরাসরি সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনো কথা বলবেন না বলে জানিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে কর্তৃপক্ষের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে কল কেটে দেওয়া হয়।
হাবিলদার ইউসুফ আলী মৃধার বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের দায়িত্বের এড়িয়া বিস্তৃত থাকলেও বেশিরভাগ সময়ই স্টেশনে দায়িত্বে পালন করতে হয়। আমাদের এখানে চাঁদাবাজির কোন সুযোগ নেই। রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়ে বলেন, সরকারি চাকরি করলে রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকার কোন সুযোগ নেই। যে সরকার আসবে আমরা তাদের পক্ষেই। রাউজানের সাবেক এমপি ফজলে করিম চৌধুরীর সাথে একটি ছবি নিয়ে বলেন, কখন ছবি তুলেছি ঠিক মনে নেই। হয়তো কেউ নিয়ে গিয়েছিলো।