ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. আবদুল্লাহ আল ইউসুফ:: প্রায়ই বন্ধুমহলের একটি সরল প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়, ইউসুফ ভাই, সত্যি করে বলেন তো, ইন্ডিয়া যদি অ্যাটাক করে, আমরা কি পারবো? মুচকি হেসে অভয় দিয়ে বলি, চিন্তা করবেন না, আমরা আছি। এমন মাইর দিবো, লেজ গুটিয়ে পালাবে। উনারা আশ্বস্ত হন। ভালো লাগে। এই সহজ সরল মানুষগুলোকে সমরবিদ্যার জটিল দর্শন বুঝিয়ে কনফিউজড করার চেয়ে সংক্ষিপ্ত উত্তর দেই। উনারা খুশি হয়ে চলে যান।
জুলাই বিপ্লবের পর কোন এক টক শোতে দেখলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের এক প্রবীণ অধ্যাপক বেশ উত্তেজিত কন্ঠে বলছেন, ভারতকে সাইজ করতে হলে আমাদের পারমানবিক শক্তি অর্জন করতে হবে।এমনকি আমার প্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকটিভিস্ট পিনাকীকেও দেখলাম উনার এক এপিসোডে পারমানবিক শক্তি অর্জনের উপর বেশ গুরুত্ব দিচ্ছেন। সেনা, নৌ এবং বিমান বাহিনীর বিদ্যমান অস্ত্রভান্ডার সীমান্তে সম্ভাব্য যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি মোকাবেলায় কতোটা কার্যকর সে নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। বাহিনীগুলো দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার সক্ষমতা রাখে কি না, সে নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। সব দেখে শুনে মনে হোল, যুদ্ধ, জাতীয় নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এসব আপাত জটিল বিষয়গুলো নিয়ে কিছুটা আলোচনা করা দরকার। বিষয়গুলো খানিকটা জটিল বলেই এ নিয়ে কখনও লিখিনি। এবার চেষ্টা করবো যতোটা সম্ভব সহজ ভাবে বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করার।
শুরুতেই দুটি কথা বলে রাখি, রাজনীতি আর রাজনীতিবিদদের হাতে নেই, চলে গেছে ব্যবসায়ীদের হাতে। তেমনি যুদ্ধ বা জাতীয় নিরাপত্তার ব্যাপারটাও আর শুধু বাহিনীগুলোর হাতে নেই, চলে গেছে অর্থনীতিবিদ, সাংবাদিক এবং অন্যান্য অনেকের হাতে। পুরো লেখাটা পড়লেই কথাগুলোর মর্মার্থ বোঝা যাবে।
প্রথমেই সার্বভৌমত্ব নিয়ে বলি। সার্বভৌমত্ব দু ধরণের- আভ্যন্তরীণ (Internal Sovereignty) এবং বহিঃস্থ (External Sovereignty)। একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে টিকে থাকতে হলে দু ধরণের সার্বভৌমত্বই অপরিহার্য। সাধারন মানুষ দেশের সার্বভৌমত্ব বলতে মূলত বহিঃস্থ সার্বভৌমত্ব বা সুরক্ষিত সীমান্তকেই বোঝে। তাই সার্বভৌমত্বের কথা উঠলেই বাহিনীগুলোর সক্ষমতার প্রশ্ন ওঠে। যে জিনিষটা সাধারন মানুষ বোঝে না, সেটি হোল, সুরক্ষিত সীমান্তের মধ্যে থেকেও একটি দেশ পরাধীন হতে পারে, যখন তার আভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্ব হারিয়ে যায়। একটু মিলিয়ে দেখুন তো, গত ষোলটি বছর কি আমরা স্বাধীন ছিলাম? ভারত তো গত ষোল বছর আমাদের সীমান্তে কোন সেনা সমাবেশ ঘটায়নি। যুদ্ধ বলতে সাধারন মানুষ যা বোঝে, তেমন কিছুই তো হয়নি ভারতের সাথে। সীমান্ত ছিল সুরক্ষিত। কিন্তু আমরা ছিলাম পরাধীন। এমনকি আমাদের একেবারেই বেসিক হিউম্যান রাইটসও ছিল না। দেশের কোন সেক্টরের কোন নীতিমালায় আমাদের নাগরিক আশা আকাঙ্ক্ষার ন্যুনতম প্রতিফলনও ছিলো না। আমাদের স্বাধীনতা ছিল না, আভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্ব ছিল না। আর সেজন্যেই আমরা ৫ ই আগস্টের বিজয়কে আমাদের দ্বিতীয় স্বাধীনতা বলছি।
হ্যাঁ, বহিঃস্থ সার্বভৌমত্বের মতো আভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্বও হারিয়ে যায় যুদ্ধে পরাজয়ের মাধ্যমে। বিগত ষোলটি বছর ভারত আমাদের উপর অনেকগুলো যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে, এবং প্রতিটিতেই আমরা হেরেছি। অথচ আমরা বুঝতেই পারিনি যে আমরা একটা নিয়ত যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। কারন, আমাদের সীমান্ত ছিল সুরক্ষিত।
আমরা সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়নের কথা শুনেছি। বিজয় দিবসের প্যারেডে মিগ-২৯ এর নানারকম কসরত দেখে রোমাঞ্চিত হয়েছি। আমাদের অস্ত্রভান্ডারে অত্যাধুনিক মিসাইল সংযুক্ত হয়েছে, আমরা সাবমেরিন কিনেছি। শুনে সবাই বাহবা দিয়েছি। একবারও ভাবিনি, সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়নের নামে ওটা ছিল একটা অর্থনৈতিক যুদ্ধ যাতে আমরা বোকার মতো ক্রমাগত হেরেই গেছি শুধু। আমরা আরও আরও বেশী ঋণের ভারে নুয়ে পড়েছি দিনের পর দিন।
ব্যাপারটা একটু বুঝিয়ে বলি। অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র কোন দেশের তুলনামূলক সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে তেমন কোন কার্যকরী ভূমিকা রাখে না। বরং এটা একটা আর্মস রেইস এর প্রেক্ষাপট তৈরী করে বিবাদমান পক্ষগুলোকে থুসিডিডিস ট্র্যাপ (Thucydides Trap) এ ফেলে দেয়। দু- পক্ষই আর্মস রেইস এ একে অন্যকে হারানোর জন্য অস্ত্র কিনতেই থাকে। মাঝখান থেকে লাভবান হয় অস্ত্র বিক্রেতারা, মিলিটারী হার্ডওয়্যার ইন্ডাস্ট্রিগুলো।
উদাহরণস্বরূপ, গণচীন আমাদের কাছে যে দু-টো সাবমেরিন বিক্রী করল, তার অল্পদিন পরেই সেই গণচীনই মিয়ানমারের কাছে অ্যান্টি সাবমেরিন মিসাইল বিক্রী করল। দু-দেশই আর্মস রেইসে এগিয়ে থাকার জন্য টাকা ঢাললো, কেউই জিতলো না। জিতল গণচীনের অস্ত্র উৎপাদনকারী সংস্থাটি।
যেদিন প্রথম মিগ-২৯ আকাশে উড়ল সেদিনের মহড়ায় অংশ নেয়া এক চৌকস পাইলট ছিল আমারই এক সতীর্থ। তাঁকে জিজ্ঞেস করে জেনেছিলাম, তখন পর্যন্ত ঐ বিমান থেকে নিক্ষেপণযোগ্য কোন মিসাইল কেনা হয়নি? পরে কিনেছে কিনা আমার জানা নেই। একটা যুদ্ধবিমান স্রেফ একটা ওয়েপন ডেলিভারি প্ল্যাটফর্ম। যদি ওয়েপনই না থাকে, সেই প্ল্যাটফর্ম দিয়ে আমরা করবোটা কি?
এভাবেই দেশদ্রোহী, ফ্যাসিবাদী, ভারতের চর হাসিনার আমলে সাবমেরিন কেনা হোত, যুদ্ধবিমান কেনা হোত কিন্তু সেগুলো থেকে নিক্ষেপনযোগ্য জুতসই কোন মিসাইল কেনা হোত না। সেনাবাহিনীর জন্য দূরপাল্লার (তথাকথিত) মিসাইল কেনা হোত। কিন্তু সেগুলোর পাল্লা বা রেঞ্জ সীমিত করে দেয়া হতো যেন তা কোলকাতা অব্দি পৌছুতে না পারে। শুধু তাই না, এই তথাকথিত দূরপাল্লার মিসাইল ঠিকমতো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে পারলো কিনা সেটা পর্যবেক্ষণ করার কিম্বা ইম্প্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট এরও কোন প্রভিশন থাকতো না।
আধুনিকায়নের নামে অস্ত্র কেনাটা ছিল স্রেফ একটা বিজনেস। এতে লাভবান হতো মিলিটারি হার্ডওয়্যার ইন্ডাস্ট্রিগুলো এবং তারেক সিদ্দিকীরা। বলাই বাহুল্য, যে কোন বড় কেনাকাটায় বড় সড়ো কমিশন থাকতো। অন্যসব সেক্টরের মতোই বখরা চলে যেতো হাসিনা-রেহানাদের কাছে।
অথচ যুদ্ধে (সামরিক) জয়লাভের জন্য অত্যাধুনিক অস্ত্রের চেয়েও অনেক অনেক বেশী কার্যকর হচ্ছে অত্যাধুনিক কৌশল। জয়ের জন্য মিলিটারী হার্ডওয়্যার এর চেয়েও অনেক বেশী প্রয়োজন হিউম্যান সফটওয়্যার। ব্যাপারটা জটিল বলে ছোট্ট একটি উদাহরণ দিয়ে সামরিক যুদ্ধের ব্যাপারটা এখানেই শেষ করছি। কয়েক ডজন যুদ্ধবিমান কিম্বা সাবমেরিন কেনার চেয়ে ওর চেয়ে অনেক অনেক কম খরচ করে আমরা যদি কয়েকজন ‘ডিজিটাল ওয়ারিওর’ তৈরী করতে পারি, জেন-জির এই চৌকষ ছেলেগুলো প্রতিপক্ষের সিস্টেম হ্যাক করে ওদের পুরো অস্ত্রভান্ডারকেই গারবেজ এ পরিণত করতে পারে। কেনাকাটায় নয়, আমাদের স্মার্ট হওয়া দরকার চিন্তাভাবনায়।
পুরো ষোলটা বছরই আমরা যুদ্ধের মধ্যে কাটিয়েছি। আমরা বুঝতেই পারিনি। ইন্টেলেকচুয়াল ওয়ার, কালচারাল ওয়ার, মিডিয়া ওয়ার সবগুলোতে আমরা হেরে গেছি কিছু না বুঝেই। না, আমাদের সীমান্তে ভারত কয়েক ডিভিশন সেনা মোতায়েন করেনি, কোন নৌ বহর বা বিমান বহর পাঠায়নি। ওরা বুদ্ধিমান শত্রু। অনেক অনেক অনেক কম খরচ করে ওরা কিনে নিয়েছে এদেশীয় কিছু বুদ্ধিজীবী এবং প্রায় সবগুলো মিডিয়া হাউজ।
ওদের পেইড এই বুদ্ধিজীবীরা ওদের পেইড মিডিয়া হাউজগুলোর মাধ্যমে অনবরত চেতনা ইঞ্জেক্ট করেছে। এমন একটা পরিস্থিতি তৈরী করেছে যেখানে ভারতপ্রেম হয়ে পড়েছিল দেশপ্রেমের সমার্থক আর ভারতবিদ্বেষ হয়ে পড়েছিল দেশদ্রোহীতার সমার্থক।
আমরা এতোই বোকা আমরা বুঝতেই পারিনি আমরা হারছি, হেরেই যাচ্ছি। যেদিন সাগর-রুনি খুন হোল, কারও কি একবারও মনে হয়েছিল, মিডিয়া যুদ্ধে আমরা দুজন টপ-রেটেড জেনারেলকে হারালাম? যেদিন কুষ্টিয়ায় আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে কুপিয়ে রক্তাক্ত করা হোল, কারও কি একবারও মনে হয়েছিল যে মিডিয়া যুদ্ধে আমাদের কমান্ডার ইন চীফ আহত হয়েছেন। হয়নি। কারন, আমরা বুঝতেই পারিনি যে ওটাও একটা যুদ্ধ ছিল, সামরিক যুদ্ধের চেয়েও ভয়ংকর একটা যুদ্ধ।
এই তো সেদিন ভারত চাপিয়ে দিল পানি যুদ্ধ। ডুবিয়ে মারল কতো শত মানুষ। অনেকেই হয়তো বুঝতেই পারল না, ওটাও একটা যুদ্ধ ছিল। তবে এই যুদ্ধটাতে ওরা আমাদের হারাতে পারেনি।
আরও একটা যুদ্ধ ধেয়ে আসছে। ভয়ংকর যুদ্ধ। এটা অবশ্য ভারতের একটা প্রক্সি যুদ্ধ। এটাতে অংশ নিচ্ছে দেশের আনাচে কানাচে লুকিয়ে থাকা ভারতের সমর্থনপুষ্ট ফ্যাসিবাদের প্রেতাত্মারা। এ যুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে ‘ক্ষুধা’। বিপুল ক্যাশ টাকা নিয়ে লুকিয়ে থাকা ফ্যাসিবাদী হাসিনার এই বিত্তশালী অনুচররা দেশে কৃত্রিম তারল্য সংকট তৈরী করেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের দাম আকাশ ছুঁয়েছে। ধেয়ে আসছে ক্ষুধা, অভাব আর দুর্ভিক্ষ।
ক্ষুধার্ত মানুষ ধীরে ধীরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপর আস্থা হারাবে। পথে নামবে, দাবী দাওয়া নিয়ে সোচ্চার হবে। সরকার জনসমর্থন হারাবে। আর যখনই সরকার পরিস্থিতি এবং জনগণের উপর নিয়ন্ত্রণ হারাবে, তখনই আবারও বিপন্ন হবে আমাদের আভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্ব। অনেক অনেক টাকার পাহাড় নিয়ে তখন এগিয়ে আসবে ফ্যাসিবাদের অনুচররা। কিনে নেবে ক্ষুধার্ত, হতাশ জনতার আনুগত্য।
এই যুদ্ধে তো সেনাবাহিনীর কিছু করার নেই। সামরিক সক্ষমতা বাড়িয়ে কি একের পর এক চাপিয়ে দেয়া এসব যুদ্ধে জেতা যাবে? না, যাবে না। আসন্ন যুদ্ধটিতে নেতৃত্ব দিতে হবে জেনারেল সালেহ উদ্দীনকে। ঠিকই ধরেছেন, অর্থ উপদেষ্টার কথাই বলছি। এজন্যেই শুরুতেই বলেছি, জাতীয় নিরাপত্তাটা আর শুধু বাহিনীগুলোর হাতে নেই, ওটা চলে গেছে অর্থনীতিবিদ, সাংবাদিক এবং অন্যান্য আরও অনেকের হাতে।
তাই, শুধু জেনারেল ওয়াকার কি করছেন, সার্বভৌমত্বের কি হবে, সেনাবাহিনী প্রস্তুত কি না এসব জিজ্ঞেস না করে মাঝে মাঝে জেনারেল সালেহ উদ্দীনরা কি করছেন সে প্রশ্নও তুলুন। ঐ যুদ্ধগুলো কিন্তু সামরিক অভিযানের চেয়ে কোন অংশেই কম ভয়াবহ নয়।
আর হ্যাঁ, পারমানবিক সক্ষমতার কথা বলেছিলাম। এখন নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, যে টাকা খরচ করে পারমানবিক শক্তিধর হবার কথা ভাবছেন, তার চেয়ে অনেক অনেক অনেক কম খরচ করে মানুষের ক্ষুধা মেটানোর কথা ভাবুন। দেশ নিরাপদ থাকবে, সার্বভৌমত্ব অটুট থাকবে।
লেখক : ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. আবদুল্লাহ আল ইউসুফ, সাবেক সেনা কর্মকর্তা