প্রয়াত আবদুল্লাহ আল নোমান : জাতীয় রাজনীতির অবিস্মরণীয় অধ্যায়

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’র সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান, চট্টগ্রামের প্রতিথযশা রাজনীতিবিদ, সাবেক মন্ত্রী এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর সন্তান মরহুম আবদুল্লাহ আল নোমান ছিলেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন ছিল সংগ্রাম, ত্যাগ ও জনগণের প্রতি নিবেদনের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি বিএনপি তথা দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এক আপসহীন কণ্ঠস্বর হয়ে বেঁচে ছিলেন। ষাটের দশকের শুরুতে শিক্ষা আন্দোলনের সময় আবদুল্লাহ আল নোমান রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে যোগ দিয়ে তিনি যুক্ত হন ছাত্র ইউনিয়নে। পরবর্তীতে তিনি মেননপন্থি ছাত্র ইউনিয়নের চট্টগ্রাম মহানগরের সাধারণ সম্পাদক, বৃহত্তর চট্টগ্রামের সভাপতি এবং কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষাজীবন শেষে তিনি মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে শ্রমিক রাজনীতিতে যুক্ত হন। পূর্ববাংলা শ্রমিক ফেডারেশনের সহ-সভাপতি হিসেবে শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন। এসময় তিনি ভাসানীপন্থি ন্যাপের সঙ্গেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন এবং ১৯৭০ সালে ন্যাপের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন।
১৯৭১ সালে তিনি মুক্তিকামী জনতার সঙ্গে যোগ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। একজন সংগঠক মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মুক্তিকামী জনতাকে সংগঠিত ও পরিচালনায় তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এভাবেই তিনি জনগণের হৃদয়ে  স্থায়ীভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। স্বাধীনতার পর কিছুদিন ন্যাপের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলেও ১৯৮১ সালে তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বিএনপিতে যোগ দেন। ৮০’র দশকে শহীদ জিয়ার শাহাদাতের পর চট্টগ্রামে বিএনপি প্রায় স্তব্ধ হয়ে পড়েছিল। সে সময় আবদুল্লাহ আল নোমান দলকে পুনর্জাগরণের নেতৃত্ব দেন। পরবর্তীতে ৯০-এর দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তার বলিষ্ঠ ভূমিকা বিএনপিকে ক্ষমতায় আনতে সহায়ক হয়। তিনি দ্রুতই বিএনপির কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে অপরিহার্য হয়ে ওঠেন। তার সাংগঠনিক দক্ষতা, আপোষহীন অবস্থান এবং তৃণমূলের সাথে নিবিড় সম্পর্ক তাকে দলের ভরসাস্থল বানায়।
জনতার হৃদয়ের মনিকোঠায় জায়গা করে নেয়া আবদুল্লাহ আল নোমান একাধিকবার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তিনি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও ২০০১ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তিনি খাদ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মন্ত্রী হিসেবে তার সততা, পেশাদারিত্ব এবং উন্নয়নমুখী কর্মকাণ্ড জনগণের প্রশংসা কুড়ায়। তার উদ্যোগে চট্টগ্রামসহ সারাদেশে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও কৃষি উন্নয়নে বহু প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়।
আবদুল্লাহ আল নোমান শিক্ষাক্ষেত্রের উন্নয়নে বিশেষ অবদান রেখেছেন। ১৯৯৫ সালে তিনি চট্টগ্রাম সরকারি ভেটেরিনারি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। ২০০৬ সালে তার হাত ধরে এ কলেজকে উন্নীত করা হয় চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় (সিভাসু)। আজ সিভাসু বাংলাদেশের পশুচিকিৎসা শিক্ষা ও গবেষণার অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া তিনি চট্টগ্রাম জুড়ে বহু স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছেন। চট্টগ্রামের বন্দর, সড়ক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নেও তার ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য।
জাতীয় রাজনীতিতে তিনি ছিলেন একজন প্রাজ্ঞ, অভিজ্ঞ ও জনঘনিষ্ঠ নেতা। সংসদ, মন্ত্রিসভা ও বিএনপির নীতিনির্ধারণী পরিমণ্ডলে তার মতামত ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি সবসময় গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও মানুষের মৌলিক অধিকারের প্রশ্নে আপোষহীন অবস্থান নিয়েছেন। দলের দুঃসময়ে মামলা, কারাবরণ ও রাজনৈতিক নির্যাতন তাকে পিছু হটাতে পারেনি। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি বিএনপির প্রতি অবিচল থেকে কাজ করেছেন।
মরহুম জননেতা আবদুল্লাহ আল নোমান ছিলেন প্রগতিশীল, সংস্কৃতিমনা, ধর্মভীরু ও সজ্জন মানুষ। তার চিন্তা-চেতনায় যেমন প্রগতিশীলতা স্থান পেয়েছে, তেমনি জাতীয়তাবাদ ও বহুদলীয় গণতান্ত্রিক চেতনার প্রতিও ছিল অটুট বিশ্বাস। তার একটি উক্তি বিশেষভাবে অনুপ্রেরণাদায়ী – “বিনয়ী থাকুন, ক্ষুধার্ত থাকুন। সন্দেহকে অতিক্রম করুন, ঈর্ষাকে শান্ত করুন, এবং অহংকারকে আপনাকে প্ররোচিত করতে দেবেন না। কাজ চালিয়ে যান।  প্রকৃত অগ্রগতি তাদের দ্বারাই গড়ে ওঠে যারা ভয় বা অলসতাকে জয়ী হতে দেয় না।”
মরহুম আবদুল্লাহ আল নোমান ছিলেন বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির এক সোনালি অধ্যায়। মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন সংগঠক, বিএনপির পুনর্জাগরণের নেতৃত্বদানকারী, তৃণমূলের প্রাণের নেতা এবং মন্ত্রী হিসেবে সৎ ও দক্ষ প্রশাসক, সব ভূমিকায় তিনি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। তার মতো সৎ, নিষ্ঠাবান ও দেশপ্রেমিক নেতৃত্ব আজকের বাংলাদেশে বিশেষভাবে প্রয়োজন। তার মৃত্যুতে বিএনপি ও জাতীয় রাজনীতিতে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। তিনি চিরদিন বীর চট্টলার মানুষ ও বাংলাদেশের জনগণের হৃদয়ে অম্লান হয়ে থাকবেন। মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে প্রিয় নেতা মরহুম জননেতা আবদুল্লাহ আল নোমানের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।

 

লেখক:

মোহাম্মদ মঈনুল আলম ছোটন

আহ্বায়ক – শহীদ জিয়া স্মৃতি সংসদ, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা।