বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে গ্রাজুয়েশন ও পোস্ট গ্রাজুয়েশন শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করেছিলেন নায়লা শারাফ। যোগ দিয়েছিলেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) সহকারী প্রকৌশলী পদে। পরে চাকরি ছেড়ে যোগ দেন জনতা ব্যাংকে। সেখানেও থিতু হননি। এরপর বিসিএসের প্রস্তুতি নিয়ে প্রথমবারেই লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিসিএসের চাকরিও বেছে নেননি তিনি।
বরং নায়লা শারাফ এখন শিক্ষকতা করছেন নেত্রকোনার একটি প্রত্যন্ত গ্রাম পঞ্চাননপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বুয়েটের প্রকৌশলী থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, তার এই পেশাগত যাত্রা অনেকের কাছেই ব্যতিক্রমী।
নায়লা শারাফের শিক্ষাজীবনের শুরু রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে। সেখান থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে ভর্তি হন বুয়েটে। উচ্চশিক্ষা শেষে চাকরিতে যোগ দেওয়ার পরও প্রচলিত ক্যারিয়ারধারায় স্থায়ী হননি তিনি।
এলজিইডিতে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে চাকরি করার পর একপর্যায়ে সেটি ছেড়ে দেন। পরে জনতা ব্যাংকে ‘এক্সিকিউটিভ অফিসার’ হিসেবে যোগ দিলেও সেখানকার চাকরিও ছেড়ে দেন। এরপর বিসিএসের প্রস্তুতি নেন। প্রথমবারের বিসিএস পরীক্ষায় লিখিত ধাপ পেরিয়ে গেলেও ভাইভায় অংশ নেননি। এর আগেই তিনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে যোগ দেন।
বর্তমানে নেত্রকোনা সদর উপজেলার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের পড়াচ্ছেন নায়লা। তার কাছে পেশা হিসেবে শিক্ষকতা বেছে নেওয়ার বিষয়টি মূলত ব্যক্তিগত মূল্যবোধ ও জীবনদর্শনের সঙ্গে সম্পর্কিত।
নিজের সিদ্ধান্তের বিষয়ে নায়লা শারাফ বলেন, ‘আমার অর্থের প্রতি কোনো লোভ নেই, খ্যাতির জন্যও কোনো মোহ নেই। আমি খুব অল্পতেই খুশি হয়ে যাই। একটা চকলেট কিংবা কেউ ভালোবেসে একটা ফুল দিলেই আমার মন ভরে যায়। আমার এত অর্থ বা এত বড় পদের প্রয়োজন নেই। আমি সাধারণ জীবন পছন্দ করি এবং দিনশেষে একটা নিশ্চিন্তের, পরিতৃপ্তির ঘুম চাই।’
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের ভাষ্য, নায়লা শারাফ শিক্ষার্থীদের প্রতি আন্তরিক। তিনি শিশুদের নিজের সন্তানের মতো দেখেন এবং পাঠদানকে আনন্দদায়ক করতে নিয়মিত বাড়তি উদ্যোগ নেন। নিজ হাতে ছবি আঁকা থেকে শুরু করে ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরির কাজও করেন বিদ্যালয়ে। শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা ও সততার বিষয়েও গুরুত্ব দেন তিনি।
প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘নায়লা ম্যাডাম আমাদের বিদ্যালয়ের এক অমূল্য সম্পদ। শিশুদের নিজের সন্তানের মতো ভালোবেসে পড়াচ্ছেন, তা সত্যিই বিরল। তিনি কখনো ঘড়ির কাঁটা দেখে স্কুলে আসেন বা যান না। তার মতো আদর্শবান শিক্ষক প্রতিটি স্কুলেই প্রয়োজন।’
নায়লার এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের মধ্যেও নানা প্রতিক্রিয়া রয়েছে। তাকে স্বজনরা বলেন পাগল। তাদের ভাষ্য এভাবেও নিজের জীবন নিয়ে কেউ জুয়া খেলে। কোথায় থাকার কথা নায়লার, আর তিনি কি না আছেন প্রাইমারি স্কুলের বাচ্চাদের সঙ্গে।
উচ্চশিক্ষা শেষে প্রকৌশলী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করা, ব্যাংকে চাকরি এবং বিসিএসের সুযোগ থাকার পরও প্রত্যন্ত গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা বেছে নেওয়াকে অনেকেই ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন।
তবে নায়লা শারাফের কাছে জীবনের সাফল্য শুধু উচ্চপদ বা আর্থিক স্বচ্ছলতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিশুদের শিক্ষা দেওয়া এবং তাদের সঙ্গে সময় কাটানোর মধ্যেই তিনি খুঁজে পেয়েছেন নিজের পেশাগত ও ব্যক্তিগত তৃপ্তি।
তার এই পথচলা প্রচলিত ক্যারিয়ার ভাবনার বাইরে হলেও শিক্ষকতা পেশার প্রতি এক ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির উদাহরণ হয়ে উঠেছে। উচ্চশিক্ষিত ও মেধাবীদের বড় একটি অংশ যেখানে শহরকেন্দ্রিক পেশা ও সুযোগের দিকে এগিয়ে যান, সেখানে নায়লা শারাফ বেছে নিয়েছেন গ্রামের শিশুদের এগিয়ে নেওয়ার পথ।
খবর : কালবেলা অনলাইন