বিদ্যুৎ চলে গেলেই পুরো হাসপাতালজুড়ে নেমে আসে এক ভূতুড়ে অন্ধকার। আলো বলতে কেবল চিকিৎসকের হাতের মুঠোফোনটি! সেই ফোনের সামান্য ফ্ল্যাশলাইটের আলোতেই মুমূর্ষু রোগীকে দেখছেন কর্তব্যরত চিকিৎসক, লিখছেন প্রেসক্রিপশন। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে দাঁড়িয়ে এমন দৃশ্য কেবল বিরলই নয়, চরম মানবেতর। দক্ষিণ চট্টগ্রামের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা কেন্দ্র ‘দোহাজারী ৩১ শয্যা বিশিষ্ট সরকারি হাসপাতাল’র প্রতিদিনের চেনা দৃশ্য এখন এটি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গুরুত্বপূর্ণ এই সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে জরুরি বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য কোনো সরকারি জেনারেটর নেই। দীর্ঘদিন আগে চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত উদ্যোগে ও নিজস্ব অর্থায়নে দুটি আইপিএস কেনা হয়েছিল। তবে বছরের পর বছর অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে সেগুলোর কার্যক্ষমতা এখন তলানিতে। দুটি আইপিএস থাকলেও ব্যাটারিগুলো নষ্ট থাকায় সেগুলো এখন সম্পূর্ণ অকেজো। ফলে সামান্য লোডশেডিং হলেই পুরো হাসপাতাল অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়।
চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা নিজেদের সর্বোচ্চ উজার করে সেবা দেওয়ার চেষ্টা করলেও পর্যাপ্ত উপকরণের অভাবে হিমশিম খাচ্ছেন। প্রচণ্ড গরমে রোগীদের যেমন নাভিশ্বাস উঠছে, তেমনি মোমবাতি বা মোবাইলের আলোয় ইনজেকশন দেওয়া বা ড্রেসিং করার মতো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে হচ্ছে চিকিৎসকদের। এতে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন ভুক্তভোগীরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক নার্স ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, রাতে বিদ্যুৎ গেলে মোমবাতি কিংবা মোবাইলের আলোতে রোগীদের ক্যানোলা পরানো ও প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র প্রস্তুত করতে হয়। সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত আলোর অভাবে কাঙ্ক্ষিত সেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
জরুরি বিভাগ ও ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা রোগীদের ফলোআপ করতে গিয়ে মারাত্মক বিড়ম্বনায় পড়েন চিকিৎসকরা। টর্চলাইটের স্বল্প আলোতে আহত রোগীদের কাটাছেঁড়া সেলাই ও ব্যান্ডেজ করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।
দোহাজারী হাসপাতালটি ৩১ শয্যার হলেও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে চন্দনাইশ উপজেলার দোহাজারী পৌরসভা, বৈলতলী, সাতবাড়িয়া ও ধোপাছড়ি ইউনিয়ন ছাড়াও পার্শ্ববর্তী সাতকানিয়া উপজেলার খাগরিয়া, কালিয়াইশ, নলুয়া, ধর্মপুর ও পুরানগড় ইউনিয়নের মানুষ প্রতিদিন এখানে সেবা নিতে আসেন। কাগজে-কলমে ৩১ শয্যা হলেও প্রতিদিন গড়ে ৬০ থেকে ৭০ জন ভর্তি রোগী থাকেন।বিদ্যুৎ চলে গেলে দিনে অসহনীয় গরম এবং রাতে ঘন অন্ধকার ও মশার উপদ্রবে চরম দুর্ভোগে পড়তে হয় রোগী ও স্বজনদের। গরম ও অন্ধকারের কারণে অনেক রোগী রাতে ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়াও করতে পারেন না।
হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. আমির খসরু হৃদয় বলেন,”ধারণক্ষমতার তুলনায় দ্বিগুণ রোগী সেবা নেন এখানে। দিনে বিদ্যুৎ গেলে অসহনীয় গরম এবং রাতে অন্ধকারে মোমবাতি বা মোবাইলের আলোয় চিকিৎসা দিতে হয়, যা অত্যন্ত কষ্টদায়ক এবং সেবাকাজে বড় ধরনের ব্যাঘাত সৃষ্টি করে।”
হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. রকিবুল হাসান মারুফ বলেন,”বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে হাসপাতালের স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা পরিচালনায় বেশ কিছু সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। বিশেষ করে জরুরি বিভাগে রোগী দেখা, ক্ষতস্থানে সেলাই, ড্রেসিংসহ বিভিন্ন জরুরি চিকিৎসাসেবা প্রদানে পর্যাপ্ত আলোর অভাবে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে হাসপাতালের জন্য একটি কার্যকর জেনারেটর এবং প্রয়োজনীয় বিকল্প বিদ্যুৎব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছি।”
লোডশেডিংয়ের সময় বিকল্প পন্থায় হাসপাতালে বিদ্যুৎ সরবরাহের সুযোগ আছে কিনা জানতে চাইলে দোহাজারী বিদ্যুৎ সরবরাহের আবাসিক প্রকৌশলী রোকুনুজ্জামান জানান, ”পুরো দোহাজারীতে দুটি ফিডার- দোহাজারী ও ধর্মপুর। হাসপাতালটি দোহাজারী ফিডারের আওতাধীন। লোডশেডিং চলার সময় এক ঘণ্টা পর পর বিকল্প ফিডারে বিদ্যুৎ চালু রাখা হয়। লোডশেডিং সহনীয় পর্যায়ে রাখার জন্য সাতকানিয়া উপকেন্দ্রের সাথে সমন্বয় করে লোডশেডিং চলার সময় এক ঘণ্টার পরিবর্তে দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখার চেষ্টা করছি। তবে হাসপাতালের জন্য আলাদা বিকল্প লাইনে বিদ্যুৎ দেওয়ার সুযোগ নেই; এজন্য পুরো লাইন নতুন করে করতে হবে, যা সময়সাপেক্ষ এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের এখতিয়ারভুক্ত।”
হাসপাতালে ভর্তি থাকা রোগী ও তাদের স্বজনেরা জানান, একটি সরকারি হাসপাতাল কখনোই সম্পূর্ণ বিকল্প ব্যবস্থাহীন অবস্থায় থাকতে পারে না। কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা থাকলেই এ সমস্যার দ্রুত সমাধান সম্ভব। দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অসহায় ও দরিদ্র রোগীদের দুর্ভোগ লাঘবে জরুরি ভিত্তিতে একটি শক্তিশালী জেনারেটর স্থাপনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।