চট্টগ্রামে হচ্ছে হার্ট ফাউন্ডেশন,নতুন দুটি হাসপাতাল
কালুরঘাট নতুন সেতুর কাজ শুরু
চট্টগ্রাম: মাতৃভূমিতে ব্যস্ত দিন বুধবার (১৪ মে) অতিবাহিত করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। প্রধান উপদেষ্টাকে সম্মানসূচক ডি-লিট ডিগ্রি দিয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) কর্তৃপক্ষ। চট্টগ্রামে হচ্ছে পূর্ণাঙ্গ হার্ট ফাউন্ডেশন নতুন দুটি সরকারি হাসপাতাল। শুরু হল দীর্ঘ প্রত্যাশার কালুরঘাট নতুন সেতুর কাজ।
এর আগে সকালে চট্টগ্রামে পৌঁছান প্রধান উপদেষ্টা। সরকার প্রধানের দায়িত্ব নেয়ার পর এটি তার প্রথম চট্টগ্রাম সফর। চট্টগ্রামের ভূমিপুত্র হিসেবে নিজ এলাকায় আসায় তাকে স্বাগত জানানো হয়। বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান চসিক মেয়র ডা. শাহাদাতসহ ঊর্ধতন কর্মকর্তারা।
জলাবদ্ধতা চলতি মৌসুমে অর্ধেকে নামিয়ে আনার নির্দেশনা
চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা চলতি বছরের বর্ষা মৌসুমে আগের তুলনায় অর্ধেকে এবং ক্রমান্বয়ে শূণ্যে নামিয়ে আনতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস।
চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজ সম্মেলন কক্ষে চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসন বিষয়ক এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এই নির্দেশনা দেন প্রধান উপদেষ্টা। এসময় তিনি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, জেলা প্রশাসনসহ স্থানীয় সেবা কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত অন্যান্য সকল প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের নানা উদ্যোগ ও অভিজ্ঞতার কথা শোনেন।
প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘আমরা অনেক রকম থিওরিটিক্যাল আলোচনা করেছি, সেসব আর করতে চাইনা, আমরা চাই জলাবদ্ধতার সমস্যা থেকে চিরতরে বের হয়ে আসতে। কিন্তু সেটা একবারেই হবে না, তাই আমাদেরকে ক্রমান্বয়ে অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে হবে,’।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “এবছর যেহেতু বর্ষা মৌসুম ইতোমধ্যে এসে গেছে তাই এবার সমস্যা পুরোপুরি সমাধান সম্ভব হবে না। কিন্তু গত কয়েক মাসে সিটি কর্পোরেশনসহ স্থানীয় সরকারের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলো সম্মিলিতভাবে যে প্রচেষ্টা চালিয়েছে তাতে যদি এবছর যদি তারা আশানুরূপ ফল না আসে তাহলেতো সব কিছু মনে হবে জলে গেল।”
চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসন এবং অক্সিজেন-হাটহাজারী মহাসড়কের উন্নয়ন সংক্রান্ত মতবিনিময় সভায় অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতু উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, শিক্ষা উপদেষ্টা সি. আর আবরার, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার, স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নুরজাহান বেগম, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক–ই–আজম, প্রধান উপদেষ্টার স্পেশাল এনভয় লুৎফে সিদ্দিকী, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন, এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক লামিয়া মোরশেদসহ আরও অনেকে।
দেশের অর্থনীতি পাল্টাতে চট্টগ্রাম বন্দরই আমাদের ভরসা
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির পরিবর্তনে চট্টগ্রাম বন্দরই মূল ভরসা। এটি বাদ দিয়ে দেশের অর্থনীতিকে নতুন কোনো অধ্যায়ে প্রবেশ করানোর সুযোগ নেই। বন্দরের পথ উন্মুক্ত হলে দেশের অর্থনীতিরও অগ্রগতি হবে। অন্যথায় যতই চেষ্টা করা হোক, অর্থনৈতিক উন্নতি সম্ভব নয়।
সকালে চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি-৫ প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
চট্টগ্রাম বন্দরকে দেশের অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, হৃৎপিণ্ড যদি দুর্বল হয়, তাহলে শরীর চলতে পারে না। এই হৃদপিণ্ডকে যতই চাপ দেওয়া হোক, রক্ত সঞ্চালন হবে না। বন্দরকে বিশ্বমানের করে তুলতে হবে। তখনই দেশের অর্থনীতিতে গতিশীলতা আসবে। এখান থেকেই বিদেশে পণ্য রপ্তানি হবে এবং বিদেশি পণ্য আমদানি করা যাবে। এটাই বন্দরের মূল কাজ।
প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, দুঃখের বিষয় হলো, চট্টগ্রাম বন্দরের পরিবর্তন এতটা শ্লথ কেন? বিশ্বব্যাপী সবকিছু বদলাচ্ছে, অথচ এখানে তেমন অগ্রগতি নেই। এটি আজকের প্রশ্ন নয়।
চট্টগ্রাম বন্দর পরিদর্শন শেষে সার্কিট হাউসে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি চট্টগ্রাম হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালের জন্য ২৩ একর জমির নিবন্ধিত দলিল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো নিজ জেলা চট্টগ্রামে পৌঁছেছেন অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
চট্টগ্রামের কালুরঘাটে কর্ণফুলী নদীর ওপর বহুল প্রত্যাশিত রেলসহ সড়ক সেতু নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। সকাল ১১টায় চট্টগ্রামের সার্কিট হাউস থেকে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের ফলক উন্মোচন করেন তিনি।
‘সমাবর্তী-শিক্ষার্থী তারুণ্যকে বিশ্ব গড়ার স্বপ্ন দেখার তাগিদ’
সমাবর্তী-শিক্ষার্থী তারুণ্যকে বিশ্ব গড়ার স্বপ্ন দেখার তাগিদ দিয়ে প্রধান উপদেষ্টা নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, স্বপ্ন না দেখে গর্তের মধ্যে ঢুকে থাকলে, যা আছে তা-ই মেনে নিলে কোনো পরিবর্তন সম্ভব নয়।
বিকেলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পঞ্চম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তার বক্তব্যে প্রধান উপদেষ্টা এ কথা বলেন।
শিক্ষা-গবেষণায় নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন দেখার তাগিদ দিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা যে ধরনের বিশ্ব গড়তে চাই, সেই বিশ্ব গড়ার ক্ষমতা আমাদের আছে, সকল মানুষেরই আছে। কিন্তু আমরা গৎবাঁধা পথে চলে যাই বলে নতুন পৃথিবীর কথা চিন্তা করি না। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় যেন সবসময় এটা স্মরণ রেখেই তার পাঠদান কর্মসূচি, তার গবেষণা শিক্ষক ও ছাত্রদের জন্য চালু রাখে যে আমরা শুধু খণ্ডিত বিষয়ের গবেষণা করার জন্য নিয়োজিত নই। আমরা প্রত্যেকটি বিষয়ের পেছনে একটিই উদ্দেশ্য, সমস্ত বিশ্বকে আমাদের মনের মতো করে সাজানোর জন্য, মনের মতো করে বানানোর জন্য। আমাদের যদি সেই লক্ষ্য না থাকে, তাহলে গন্তব্যহীন গবেষণা, গন্তব্যহীন শিক্ষায় পরিণত হবে।’
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘এ পৃথিবীর ভবিষ্যত আমাদের প্রত্যেকের হাতে। আমরা যেভাবে বিশ্বকে গড়তে চাই সেভাবেই বিশ্ব গড়তে পারি। আমি যেভাবে বলেছি সেভাবে গড়তে হবে এমন কোনো কথা নেই। আমি আমার কথাটা বলে যাচ্ছি। অন্যরা তাদেরটা বলবে। কিন্তু নিজের মনের একটা স্বপ্ন থাকতে হবে এটাই আমার আবেদন। আমি কী ধরনের বিশ্ব চাই, কী ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা চাই, কী ধরনের সমাজ চাই, কী ধরনের দেশ চাই- সবকিছু নিয়ে নিজের মনের মাধুরী মিশিয়ে একটা স্বপ্ন থাকতে হবে। কিন্তু স্বপ্ন না দেখে গর্তের মধ্যে ঢুকে গেলাম, যা আছে মেনে নিলাম, তাহলে কিছুই পালটাবে না, কিছুই পরিবর্তন হবে না।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. ইয়াহ্ইয়া আখতারের সভাপতিত্বে এতে শিক্ষা উপদেষ্টা সি. আর আবরার ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান এস এম ফয়েজ বক্তব্য দেন।
হাটহাজারী-কর্ণফুলীতে দুটি হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে: স্বাস্থ্য উপদেষ্টা
চট্টগ্রামের হাটহাজারী ও কর্ণফুলী এলাকায় আলাদা দুটি হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম। এছাড়া কালুরঘাট এলাকায় একটি ডেন্টাল কলেজ ও ডেন্টাল হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনাও আছে বলে জানান তিনি।
চট্টগ্রামের সার্কিট হাউজে ‘চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসন এবং অক্সিজেন-হাটহাজারী মহাসড়কের উন্নয়ন’ সংক্রান্ত মতবিনিময় সভায় অংশ নেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। এসময় তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নুরজাহান বেগম। সভায় বন্দরনগরীর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওপর রোগীর ব্যাপক চাপ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের প্রতিক্রিয়ায় এ কথা জানান স্বাস্থ্য উপদেষ্টা।
উপদেষ্টা নুরজাহান বেগম বলেন, আমি হাসপাতালটি পরিদর্শন করেছি। আমি দেখেছি ধারণক্ষমতা ২২০০ কিন্তু প্রায় ৫ হাজার রোগী। ব্রেইন সার্জারির রোগীকে ফ্লোরে শুইয়ে চিকিৎসা দেয়া হয়, টয়লেটের পাশেও রোগী ফ্লোরে শুয়ে চিকিৎসা নেয়। স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হাটহাজারী ও কর্ণফুলী এলাকায় দুটি হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা চলছে। এতে করে রাঙামাটি-কাপ্তাই ওদিকের অঞ্চলের রোগীরা হাটহাজারী হাসপাতালে সেবা নিতে পারবেন এবং পটিয়া-সাতকানিয়া-চন্দনাইশ অঞ্চলের রোগীরা কর্ণফুলী হাসপাতালে সেবা নিতে পারবেন।
নুরজাহান বেগম আরও বলেন, চট্টগ্রামে কোনো ডেন্টাল কলেজ ও ডেন্টাল হাসপাতাল নেই। একটি ডেন্টাল কলেজ-হাসপাতাল নির্মাণের জন্যও পরিকল্পনা চলছে,
সভায় অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষা উপদেষ্টা সি. আর আবরার, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক-ই–আজম, প্রধান উপদেষ্টার স্পেশাল এনভয় লুৎফে সিদ্দিকী, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন, এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক লামিয়া মোরশেদসহ আরও অনেকে।