নিরাপদ ও ব্যবসাবান্ধব বন্দর হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরকে প্রতিষ্ঠিত করতে সকল স্টেক হোল্ডারদের সমন্বিত উদ্যোগের পাশাপাশি দেশী বিদেশী বিনিয়োগের বিকল্প নেই। বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন চট্টগ্রাম বন্দর ইতোমধ্যে ডিজিটালাইজেশনের যুগে প্রবেশ করেছে। ধীরে ধীরে আধুনিক গ্রীণ পোর্ট হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরকে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার। দীর্ঘ ও স্বল্প মেয়াদী গৃহীত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে বিশে^ চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান অনেক উপরে চলে আসবে বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এসএম মনিরুজ্জামান।
বৃহস্পতিবার (২৪ এপ্রিল) দুপুরে ১৩৮তম বন্দর দিবস উপলক্ষে শহীদ মোঃ ফজলুর রহমান মুন্সী মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি উপরোক্ত মন্তব্য করেন।
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানের বীর শহীদদের আত্মত্যাগ এবং অসংখ্য ছাত্র-জনতার অঙ্গহানির শিকার হয়ে পঙ্গুত্ব বরণের বিনিময়ে ফ্যাসিবাদ মুক্ত হয়ে আমাদের প্রিয় জন্মভূমি নবজন্ম লাভ করেছে দাবি করে বন্দর চেয়ারম্যান তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন তাদের দেশপ্রেম ও দূরদর্শিতার জন্য। এতে করে দেশের প্রতি বিদেশীদের আস্থাও ফিরেছে উল্লেখ করে বলেন, বিশ্ব অর্থনীতির প্রত্যাশিত গতিকে মন্থর করলেও চট্টগ্রাম বন্দরের কন্টেইনার হ্যান্ডলিং এর তেমন প্রভাব ফেলেনি, বরং কার্গো ও কন্টেইনার হ্যান্ডলিং বেড়েছে এবং রপ্তানী আয়ে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায় যে, মার্চ ২০২৫ এ রপ্তানী আয়ে মার্চ ২০২৪ এর চেয়ে ১৯:৪৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) ৩৭১৯১.৩২ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে যা ২০২৩-২০২৪ অর্থ বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০.৬৩ শতাংশ বেশি (সূত্র-ইপিবি এর ওয়েবসাইট)। এ রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ (৮৫ শতাংশ) রপ্তানি পণ্য চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে হ্যান্ডলিং হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, চট্টগ্রাম বন্দরে ২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) কন্টেইনার হ্যান্ডলিং ২০২৩-২০২৪ এর একই সময়ের তুলনায় ৫.০১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়াও ২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) জেনারেল কার্গো হ্যান্ডলিং হয়েছে ৯ কোটি ৭১ লক্ষ ১৩ হাজার ১শত ৬১ মেট্রিক টন যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৫.৯৬ শতাংশ বেশি। বর্তমান অর্থ বছরের প্রথম ৯ মাসে জাহাজ হ্যান্ডলিং হয়েছে ৩০৫৮টি। এতে বুঝা যায় বাংলাদেশের অর্থনীতি শত প্রতিকূলতার মাঝেও এর ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে।
এতে তুলে ধরা হয়, চট্টগ্রাম বন্দরে আধুনিক পোর্ট ইকোসিস্টেম, পোর্ট কমিউনিটি সিস্টেম প্রবর্তন, ডিজিটালাইজেশন এবং আধুনিকীকরণের মাধ্যমে একটি বিশ্বমানের বন্দরে পরিণত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সরকারী পত্র ও নথি আদান প্রদান সহজে ও দ্রুত সম্পাদনের লক্ষ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের শতকরা ৮০ ভাগ কাজ ডি-নথি পদ্ধতিতে সম্পাদনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। কর্ণফুলী নদীর সদরঘাট হতে বাকলিয়ার চর পর্যন্ত বর্জ্য অপসারণ এবং ডেজিং এর মাধ্যমে নাব্যতা বৃদ্ধি প্রকল্পে গত নয় মাসে ৯.৬০ লক্ষ ঘনমিটার সংরক্ষণ ড্রেজিং সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্পটি আগামী জুন, ২০২৫ এ সমাপ্ত হবে।
বন্দর চেয়ারম্যান বলেন, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্টের কারণে সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। বিজনেস সামিটে নতুন বিনিয়োগ আসছে। এর জন্য বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। পাঁচ বছর পর ৫ মিলিয়ন টিইইউস কনটেইনারে হ্যান্ডলিং করতে হবে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দরে টার্মিনাল ও বে টার্মিনাল নির্মাণে চুক্তি হয়েছে। এ মাস দেশ ও বন্দরের জন্য সৌভাগ্যের। ২০২৯ সালে মাতারবাড়ী সমুদ্র বন্দর অপারেশনে চলে যাবে। বন্দর ও কাস্টমসকে একসঙ্গে কাজ করতে হয়। এর সুফল দেখতে পাচ্ছেন। নিলামে গতি এসেছে।
বন্দর চেয়ারম্যান জানান, ই টিকিটিং চালু করায় সব সিস্টেমে চলে আসছে। মেরিটাইম সিঙ্গেল উইন্ডো চালু করছি। এতে বহির্বিশ্বে ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে। পেমেন্ট ডিজিটাল হয়ে যাবে। ডিজিটালাইজেশন ও ডি কার্বোনাইজেশনের বিকল্প নেই। জুনের মধ্যে বন্দরের পুরো কার্যক্রম অটোমেশন করে ফেলব। গ্রিন মেরিটাইম করিডোর হবে চট্টগ্রাম বন্দর। মাতারবাড়ী, বে টার্মিনাল, লালদিয়া হবে গ্রিন পোর্ট। এ টার্মিনালগুলো চালু হলে নতুন শিপিং রুট খুলে যাবে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত দক্ষতার সাথে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল অপারেশন ও ব্যবস্থাপনায় সৌদি আরব ভিত্তিক বেসরকারি গ্লোবাল টার্মিনাল অপারেটর আরএসজিটিআইকে সম্পৃক্ত করেছে। বিশ্বের শীর্ষ স্থানীয় টার্মিনাল অপারেটর এপিএম এর সাথে সরকারি-বেসরকারি অংশিদারিত্বের ভিত্তিতে লালদিয়া কন্টেইনার টার্মিনাল নির্মাণের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। এলক্ষ্যে নিয়োজিত ট্রানজেকশন এডভাইজার কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে কনসেশন চুক্তি স্বাক্ষর করা সম্ভব হবে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। এছাড়াও এনসিটি টার্মিনালটি একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ অপারেশনাল টার্মিনাল হওয়ায় তা পরিচালনার জন্য আন্তর্জাতিক টার্মিনাল অপারেটর নিয়োগের বিষয়টি চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য লাভজনক হবে কিনা এবং এর ফলে বাংলাদেশের বন্দর পরিচালনার দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে কিনা তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এলক্ষ্যে ট্রানজেকশন এডভাইজার কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বে-টার্মিনালের কন্টেইনার টামিনাল-১ এবং কন্টেইনার টার্মিনাল-২ নির্মাণের জন্য পিপিপি অংশীদার পিএসএ সিংগাপুর এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। গত ২০ এপ্রিল, ২০২৫ তারিখে বে-টার্মিনালের ডিপিপি একনেকে অনুমোদিত হয়েছে। এছাড়া মঙ্গলবার বে-টার্মিনালের চ্যানেলে ব্রেক ওয়াটার নির্মাণের লক্ষ্যে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সাথে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দরের বে-টার্মিনাল প্রকল্প আগামী ২০২৯-২০৩০ সালের মধ্যে সমাপ্ত করা সম্ভব হবে।
দেশের অর্থনীতির গেম চেঞ্জার খ্যাত মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর প্রকল্পটির প্যাকেজ-১ (২টি জেটি নির্মাণ) এর জন্য জাপানিজ প্রতিষ্টান পেন্টাওশান কন্সট্রাকশান কোম্পানী ও টোয়া কর্পোরেশন এর সাথে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চুক্তি স্বাক্ষর গত ২২-০৪-২০২৫ তারিখে সম্পন্ন হয়েছে। এটি দেশের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারীগ ঘটনা। মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর ২০২৯ সাল নাগাদ অপারেশনে আসবে বলে আশা করা যায়।
এরপর উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়ে সংবাদ সম্মেলনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন বন্দর চেয়ারম্যান।
চট্টগ্রাম বন্দর সচিব ওমর ফারুকের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত উক্ত সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সদস্য প্রশাসন ও পরিকল্পনা মোঃ হাবিবুর রহমান, সদস্য প্রকৌশল কমোডর কাওছার রশিদ, সদস্য হারবার ও মেরিন ক্যাপ্টেন আহমেদ আমিন আব্দুল্লাহ, প্রধান অর্থ ও হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুস শাকুর, পরিচালক (পরিবহন) এনামুল করিম, উপ সচিব (জনসংযোগ) মোঃ নাহিদ মোস্তফা, সহকারী জনসংযোগ কর্মকর্তা মোঃ সাজ্জাদ হোসাইন প্রমূখ।