সিপাহী-জনতার বিপ্লব: ইতিহাসের বাঁক বদল

মোহাম্মদ ওমর ফারুক দেওয়ান :: ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সংঘটিত সামরিক অভ্যুত্থানের প্রতিক্রিয়া হিসেবে ৭ নভেম্বর পাল্টা অভ্যুত্থান (বা সিপাহী-জনতার বিপ্লব) সংঘটিত হয়। ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমানকে বন্দী করে জেনারেল খালেদ মোশাররফ সেনাপ্রধানের পদ ও ক্ষমতা দখল করেন। এই ঘটনাকে সাধারণ সৈনিক, জুনিয়র অফিসার ও বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা ভালো চোখে দেখেনি। কর্নেল (অব.) আবু তাহেরের নেতৃত্বে ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ এবং জাসদের (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল) কর্মীরা সাধারণ সিপাহীদের মধ্যে খালেদ মোশাররফকে ‘ভারতের দালাল’ বা ভারতপন্থী হিসেবে প্রচার করেন। এ অভ্যুত্থানের ফলে সেনাসদস্যদের মধ্যে কমান্ড চেইন ভেঙে পড়ে এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্ব তীব্র আকার ধারণ করে। বন্দী থাকা মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করতে সিপাহীরা বিদ্রোহ করে। ৭ নভেম্বর ভোরে সিপাহীরা ও সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন এবং জিয়াউর রহমানকে বন্দীদশা থেকে মুক্ত করেন। পাল্টা এই অভ্যুত্থানের মুখে ৬ ও ৭ নভেম্বরে জেনারেল খালেদ মোশাররফের অনুগত সেনাদের প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে এবং ৭ নভেম্বর খালেদ মোশাররফসহ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা নিহত হন। এর মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমান ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসেন।

অভ্যুত্থানের কারণ নিয়ে বেশ কিছু ব্যাখ্যা থাকলেও সেনাবাহিনীর তৎকালীন অনেক কর্মকর্তা মনে করেন, ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর থেকেই সেনাবাহিনীতে যে বিশৃঙ্খল অবস্থা তৈরি হয়েছিল, তার একটি ফলশ্রুতি হচ্ছে নভেম্বরের অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থান।

শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার সাথে জড়িত জুনিয়র সেনা কর্মকর্তাদের ক্ষমতা প্রদর্শন সেনাবাহিনীর মধ্যে অনেকেই গ্রহণ করতে পারেননি। এর বাইরে আরেকটি দ্বন্দ্বও ছিলো, যার সূচনা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকেই। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তিনজন অফিসার ব্যাপক পরিচিতি পান । যুদ্ধের পর থেকে সেনাবাহিনীর মধ্যে এই তিনজন অফিসারের তিনটি প্রভাব বলয় তৈরি হয়েছিল। তাঁরা ছিলেন জেনারেল জিয়াউর রহমান, জেনারেল খালেদ মোশাররফ এবং জেনারেল কে এম শফিউল্লাহ। এই দ্বন্দ্বটা আগেও ছিলো, কিন্তু সেটা প্রকট হলো ১৫ই আগস্টের পরে। জেনারেল শফিউল্লাহকে অবসর প্রদান করা হলে জেনারেল জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান হলেন। এতে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের সাথে দ্বন্দ্ব আরো বেড়ে যায়। ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের দিন দশেক পর সেনাপ্রধানের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় মেজর জেনারেল কে এম শফিউল্লাহকে। এরপর থেকে তিনি নিষ্ক্রিয় এবং অনেকটা গৃহবন্দী হিসেবেই সেনাপ্রধানের বাড়িতে অবস্থান করছিলেন।
নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহকে খালেদ মোশাররফ এবং জিয়াউর রহমানের মধ্যকার দ্বন্দ্বের একটি ফলাফল হিসেবে মনে করেন কে এম শফিউল্লাহ- খালেদ মোশাররফ জিয়াউর রহমানকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। তাঁকে সরিয়ে দিয়ে হাউজ এরেস্টও করে ফেলেছিলেন এবং নিজেই চিফ অফ স্টাফের র‍্যাংক পরলেন খালেদ মোশাররফ।

মোটাদাগে খালেদ মোশাররফ অনুসারীদের পক্ষ থেকে বলা হয়, ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের পর সেনাবাহিনীতে যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল, সেখানে শৃঙ্খলা ফেরাতে খালেদ মোশাররফ ৩ নভেম্বর অভ্যুত্থান করেছিলেন। তিনি তখন চিফ অব আর্মি স্টাফ বা সিজিএস ছিলেন। আরও বলা হয়, তিনি অভ্যুত্থান করলেও পুরো সেনাবাহিনী তাঁর অধীন ছিলো না বা অধীন করতে পারেননি। সেনাবাহিনীতে জিয়াউর রহমান ব্যাপক জনপ্রিয় ছিলেন। সাধারণ সৈনিক থেকে সিনিয়র অফিসার পর্যন্ত মেজরিটি সৈনিক জেনারেল জিয়াউর রহমানকে পছন্দ করতেন। আবার সাধারণ অফিসাররা জেনারেল জিয়াকে স্বাধীনতার ঘোষক ও দেশপ্রেমিক অফিসার হিসেবে শ্রদ্ধা করতেন। পক্ষান্তরে জেনারেল খালেদ মোশাররফকে ভারতপন্থী ও আওয়ামীপন্থী মনে করা হতো। এ সন্দেহ আরও দানা বাঁধে, যখন জেলহত্যা ঘটনার পর তার প্রতিবাদে খালেদ মোশাররফের মা ও ভাই নীলক্ষেত থেকে মিছিল নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসার্স ক্লাব ও ভিসির বাসভবনের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন। ওই মিছিলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ছিলেন। তখন সবাই ধারণা করে নিলো এটা আওয়ামী লীগকেন্দ্রিক অভ্যুত্থান। তখন সারা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগবিরোধী মুডে ছিলো। এ কারণেই মানুষ খালেদ মোশাররফের বিপক্ষে চলে যায়।

এর বাইরে স্বাধীনতা যুদ্ধকালে ভারতের সাথে যে ৭ দফা চুক্তি হয়, তা বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর জন্য মর্যাদাকর ছিলো না। মনে করা হয়, ভারতের ফর্মুলায় বাংলাদেশে রক্ষীবাহিনী গঠন করা হয়েছে আর রক্ষীবাহিনী গঠনের কারণে সেনাবাহিনীকে দুর্বল করে রাখা হয়েছিল। আর জেনারেল খালেদ মোশাররফকে ভারতপন্থী মনে করায় তিনি সিপাহী ও জুনিয়র অফিসারদের সমর্থন পাননি।

সে সময় বাংলাদেশে মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন ডেভিড ইউজিন বোস্টার। ওই সময়কার ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে ১০ নভেম্বর মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছিলেন তিনি। ওই প্রতিবেদন এখনও দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অফিস অব দ্য হিস্টোরিয়ানের নথিতে সংরক্ষিত রয়েছে।

বোস্টার লিখেছেন, সেনাবাহিনীতে খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানকে তার সহকর্মী অনেক অফিসার ভালোভাবে নেননি। তাদের কাছে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের জনপ্রিয়তা ছিলো বেশি। সে সময় খালেদ মোশাররফকে দেখা হচ্ছিল ভারতীয় নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যম হিসেবে। এ ধারণাকে প্রকট করে জেল হত্যার প্রতিবাদে ঢাকায় মঙ্গল ও বুধবারের দুটি মিছিলের ঘটনা। এর পরিপ্রেক্ষিতে শুক্রবার প্রথম প্রহরেই বিদ্রোহ করে বসে সেনাবাহিনীর নিম্নপদস্থ সৈনিকরা। উৎখাত হন খালেদ মোশাররফ ও তাঁর অনুগতরা। হত্যাকাণ্ডের শিকার হন খালেদ মোশাররফ। সারারাত ও সারাদিন ধরে ঢাকায় গোলাগুলি চলে। একটি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় প্রায় ৩০ জনের মৃত্যু হয়। অন্যান্য প্রতিবেদনের ভাষ্যমতে, এ সংখ্যা শতাধিক।

কর্নেল তাহের সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগ করেন ১৯৭২ সালে। এরপর থেকে তিনি সরাসরি জাসদের রাজনীতির সাথে যুক্ত হন। এরই মধ্যে গঠিত হয় সেনাসদস্যদের নিয়ে সৈনিক সংস্থা এবং গণবাহিনী, যদিও বিষয়গুলো তখনও প্রকাশ্য ছিলো না। নভেম্বরের ৩ তারিখেই কর্নেল তাহের নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকায় আসেন এবং এরপর থেকেই সৈনিক সংস্থার সদস্যরাসহ সেনাসদস্যরা তাঁর সাথে দেখা করতে শুরু করেন। খালেদ মোশাররফ ক্ষমতা হাতে নিলেও দ্রুতগতিতে কোনো সরকার গঠন করতে পারেননি। এর মধ্যেই অনেকটা অগোচরে ঘটে যায় জেল হত্যাকাণ্ড। এসব মিলিয়ে অনেকটা ‘সরকারহীন’ অবস্থার মধ্যে ছিলো কয়েকটি দিন।
নভেম্বরের ৫ এবং ৬ তারিখে গণবাহিনী আরো সক্রিয় এবং সংগঠিত হয়ে উঠতে শুরু করে। কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে একটি অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা চলতে থাকে। গণবাহিনী যে একটি কিছু করতে যাচ্ছে সেটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে ৬ তারিখ বিকেলে, যখন ক্যান্টনম্যান্টের ভেতরে গণবাহিনীর নামে একটি লিফলেট ছড়ানো শুরু হয়। লিফলেটে খালেদ মোশাররফ, শাফায়াত জামিল এবং কর্নেল হুদাকে ‘ভারতীয় চর’ বলে প্রচার করা হয়। একটা ক্যু-তে যে হোমওয়ার্ক হয়, সেটা ছিলো না। যে যার মতো করে চলছিল। এই বিশৃঙ্খল অবস্থার মধ্যে যখন ৬ তারিখ রাতে এই লিফলেট জওয়ানদের মধ্যে ছড়ানো হলো, তখনই সবার কাছে স্পষ্ট হয়ে গেলো যে, গণবাহিনী নামে একটি ফোর্স ক্যান্টনমেন্টের ভেতর কাজ করছে।

পাল্টা অভ্যুত্থান সফল না হলে কী হতো?
এর উত্তর খোঁজা জরুরি। এ অভ্যুত্থান সফল না হলে রাষ্ট্রে একটি ভিন্ন ধরনের সামরিক ও প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে উঠত, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ও দীর্ঘমেয়াদী শাসনব্যবস্থাকে অন্য কোনো রূপ দিতে পারত। জিয়াউর রহমান তখন গৃহবন্দী ছিলেন। পাল্টা অভ্যুত্থান ব্যর্থ হলে তাঁর রাজনৈতিক ও সামরিক ক্যারিয়ার ভিন্ন দিকে মোড় নিতে পারত, এমনকি তাঁর জীবনও বিপন্ন হতে পারত। জাসদের (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল) গণবাহিনী এবং কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে যে পাল্টা অভ্যুত্থান হয়েছিল, তা ব্যর্থ হলে জাসদের নীতিনির্ধারক ও যুক্ত সামরিক কর্মীরা শুরুতেই ক্ষমতাচ্যুত বা কঠোর দমন-পীড়নের শিকার হতেন।

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের সামরিক অভ্যুত্থান (যা সিপাহী-জনতার বিপ্লব বা জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবেও পরিচিত) সফল হওয়ার ফলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক সুদূরপ্রসারী এবং মৌলিক পরিবর্তন আসে। এটি তৎকালীন তীব্র রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার অবসান ঘটিয়ে দেশের ক্ষমতা কাঠামোর আমূল পরিবর্তন ঘটায়।

রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় দর্শনে এক বড় পরিবর্তন আসে। পূর্বের ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’-এর পরিবর্তে এক নতুন রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ ধারণা প্রবর্তিত হয়, যা দেশের নাগরিকদের নতুন এক স্বতন্ত্র রাষ্ট্রীয় পরিচয় দেয়।
অভ্যুত্থানের মূল পরিকল্পনাকারী কর্নেল আবু তাহের এবং জাসদ (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল)-এর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা ব্যর্থ হয়। জেনারেল জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফেরাতে কড়া পদক্ষেপ নেন। পরবর্তীতে কর্নেল তাহেরকে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে সামরিক আদালতে ফাঁসি দেওয়া হয় এবং সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে থাকা বামপন্থী বিপ্লবী কর্মকর্তাদের নির্মূল করা হয়।

এই পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের কৌশলগত পরিবর্তন আসে। পূর্ববর্তী ভারত ও সোভিয়েতঘেঁষা অবস্থান থেকে সরে এসে বাংলাদেশ দূরপ্রাচ্য, মধ্যপ্রাচ্য এবং পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক জোরদার করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তোলে।

শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে প্রবর্তিত একদলীয় শাসনব্যবস্থা ‘বাকশাল’ বিলুপ্তির পর যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা দূর হয়। জেনারেল জিয়াউর রহমান রাজনৈতিক দল গঠনের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন এবং দেশে পুনরায় বহুদলীয় রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও নির্বাচন ব্যবস্থা চালু করেন।

এই অভ্যুত্থানের পটভূমিতেই ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীতে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে আবির্ভূত হয়।