এসব হাইব্রিড ও সুবিধাবাদীদের কারণে দলীয় শৃঙ্খলার অবক্ষয় হচ্ছে। তারা অর্থ, ক্ষমতা ও সম্পর্কের জোরে সাংগঠনিক কমিটিতে জায়গা করে নিচ্ছে। এর ফলে দলের ভেতরে বিভাজন, ক্ষোভ ও গ্রুপিং চরমে পৌঁছেছে। এছাড়াও দুর্নীতি ও অপকর্মের প্রসার বেড়ে যাচ্ছে। এইসব অনুপ্রবেশকারীদের ইন্ধনে কিছু কিছু দলের নাম বিক্রি করে দখল বাণিজ্য, চাঁদাবাজি ও নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছে কিছু নেতা-কর্মী। এতে সাধারণ জনগণের কাছে দলের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে। যারা এই ধরনের অপকর্মে জড়িত হচ্ছে তারা দলের আদর্শিক কোন নেতাকর্মী নয়। এদিকে হাইকমান্ড থেকে কড়া নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও অনেক ইউনিট কমিটি গঠনে প্রকাশ্য অনিয়ম হয়েছে। সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব অনিয়মের খবর প্রতিনিয়ত প্রকাশিত হচ্ছে। যারা ত্যাগ দিয়েছেন, সেসব প্রকৃত সংগ্রামী নেতাকর্মীদের অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে এবং
২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদমুক্ত গণতন্ত্রের পথে বাংলাদেশ নতুন দিগন্তে যাত্রা শুরু করে। সেই অভ্যুত্থানের নেতৃত্বে মাঠে ছিলো রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, ছাত্র সমাজ, শ্রমিক, সাধারণ জনতা। ফ্যাসীবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক সংগঠন বিএনপি সহ গনতন্ত্রকামী দল গুলোর নেতাকর্মীরা গণতন্ত্রের জন্য নির্যাতনের যাঁতাকলে ছিল। এই দীর্ঘ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে সবচেয়ে বেশী ত্যাগ দিতে হয়েছিল বিএনপিকে। আন্দোলনে সক্রিয় থাকা কেন্দ্র থেকে তৃণমূল কোন নেতাকর্মী আওয়ামীলীগের অত্যাচার থেকে রেহাই পাইনি। গনতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনে হারাতে হয়েছে অসংখ্য তাজা প্রাণ। হত্যা-গুম আর লক্ষ লক্ষ রাজনৈতিক মামলায় জর্জরিত হতে হয়েছিল তাদের। যেসব ত্যাগী নেতাকর্মীদের অবদানে ফ্যাসিবাদ মুক্ত বাংলাদেশ পেয়েছি, সেসব ত্যাগীরা আন্দোলনের সুফল ভোগ করতে এসে এখন অনেক দলই ভেতরে ভেতরে মারাত্মক সমস্যায় আক্রান্ত হয়েছে। মূলত হাইব্রিড ও সুবিধাবাদী অনুপ্রবেশকারীদের কারণে রাজনৈতিক সংগঠনগুলোতে আভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা বাড়ছে, শৃঙ্খলা ক্ষুণ্ন হচ্ছে, আর ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
যারা গত ১৫ বছর আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিল, এখন গণঅভ্যুত্থানের পর দ্রুত চ্যানেল পরিবর্তন করে দলে অনুপ্রবেশ করেছে, তারাই হাইব্রিড এবং যারা দুঃসময়ে হামলা-মামলা এড়িয়ে নিরাপদ দূরত্বে ছিল, এমনকি ক্ষমতাসীনদের সাথে গোপন সমঝোতায় ছিল, কিন্তু আজ দলের সুদিনে সুযোগ বুঝে সক্রিয় হয়েছে, তারাই সুবিধাবাদী। তাদের কারণে বর্তমানে দলের নির্যাতিত ও ত্যাগীদের কোণঠাসা অবস্থা। যারা দীর্ঘ সময় ধরে কারাগার, রক্ত, গুম, খুন, মামলা আর দুঃসহ জীবনের বোঝা টেনে দলের জন্য সংগ্রাম করেছে – আজ তারাই সাইড-লাইনে।
তাদের ত্যাগকে সম্মান না দিয়ে হাইব্রিডদের পুরস্কৃত করা হচ্ছে। এতে দীর্ঘদিনের ত্যাগী কর্মীরা হতাশ হয়ে পড়ছেন।
এসব অনিয়ম থেকে উত্তোরন হতে হলে অবশ্যই রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিটি কমিটি গঠনে রাজনৈতিক বায়োগ্রাফি, দুঃসময়ে ভূমিকা এবং ত্যাগের পরিমাণ যাচাই করে পদায়ন করতে হবে। ত্যাগী হামলা-মামলায় ভুক্তভোগী, কারাবন্দী ও আন্দোলনে সক্রিয়দের দলীয় পদে প্রথম অগ্রাধিকার দিতে হবে। এছাড়াও দলীয় শৃঙ্খলায় অনিয়ম করলে এর সাথে যুক্ত নেতাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক জবাবদিহিতা ও শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। দখল বাণিজ্য, চাঁদাবাজি ও অপরাধে জড়িতদের দ্রুত চিহ্নিত করে বহিষ্কার করতে হবে। দায়িত্বশীল নেতাদের জন্য নীতি, আদর্শ, স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক আচরণ নিশ্চিত করার প্রশিক্ষণ চালু করা এখন সময়ের দাবী।
বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আগামী ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছে। এই নির্বাচন বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পথকে আরও সুসংহত করতে পারে। তাই বিএনপি সহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো – নিজেদের ভেতরের বিশৃঙ্খলা দূর করা, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, জনগণের সামনে ত্যাগীদের মর্যাদা পুনঃস্থাপন করা, এবং দলীয় ভাবমূর্তিকে সম্মানিত করা। আমাদের মনে রাখা উচিত গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ছিলো ত্যাগ ও সত্যিকারের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকার। হাইব্রিড-সুবিধাবাদীদের অনুপ্রবেশে যদি রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের শুদ্ধ না করে, তাহলে সেই অঙ্গীকার ব্যর্থ হবে। এখনই সময় ত্যাগীদের সম্মান দেওয়া, সুযোগসন্ধানীদের বর্জন করা এবং জনগণের আস্থার জায়গায় পৌঁছানো।
লেখক:
মোঃ মঈনুল আলম ছোটন
আহ্বায়ক, শহীদ জিয়া স্মৃতি সংসদ,
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা।